হিমেল বাতাস, ঘন কুয়াশা ও মৃদু শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল। রংপুরের পাশাপাশি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় শীতের তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না, ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের জেলাগুলোতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ভোর ও রাতের তীব্র ঠান্ডায় খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সুযোগ কমে গেছে, কমেছে দৈনিক আয়ও। অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ রাখছেন।
হাড় কাঁপানো শীতে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে রংপুরে ১১ দশমিক ৯, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯, ডিমলায় ৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ দশমিক ৫, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১০ দশমিক ৫, লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৫ এবং গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা সহজে কাটছে না, এতে শীত আরও তীব্র হচ্ছে।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর নগরীর শীতবস্ত্রের বাজারগুলোতে বেড়েছে ক্রেতার ভিড়। স্টেশন বাজার, জামাল মার্কেট, ছালেক মার্কেট, হনুমানতলা এরশাদ হকার্স মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও ফুটপাতে নতুন ও পুরনো শীতবস্ত্রের বেচাকেনা জমে উঠেছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ সাশ্রয়ী দামে শীতের পোশাক কিনতে ভিড় করছেন পুরনো কাপড়ের দোকান ও অস্থায়ী স্টলগুলোতে। জাহাজ কম্পানি মোড়, সেন্ট্রাল রোড, পায়রাচত্বর ও টার্মিনাল এলাকার ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলছে।
রিকশাচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, দিনে যা আয় হয়, তাতে ঠিকমতো খাবার জোটানোই কষ্ট। নতুন শীতের কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই। পুরনো একটা জ্যাকেট কিনেছি, সেটাই ভরসা। একই কথা বলেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকরাও। তাদের মতে, শীত বাড়লেও আয় বাড়েনি, বরং কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহেদ আলী ও গফুর উদ্দিন জানান, এ বছর পাইকাররা পুরনো কাপড়ের দাম বেশি নিচ্ছেন। ফলে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পুরনো কাপড় আমদানির কোটা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে, যার সরাসরি চাপ পড়ছে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।
শীতের তীব্রতায় অনেক মানুষ খড়কুটো, কাঠ কিংবা পরিত্যক্ত কাগজ জ্বালিয়ে ঠান্ডা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। খোলা জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে রাত কাটানো এখন রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে।
শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ১ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতজনিত জটিলতায় শিশু ও বয়স্কসহ প্রায় ২০০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে একজন শীতজনিত জটিলতায় মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত জ্বরে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে টানা আট দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। জানুয়ারি মাসেও পাঁচ দিন সূর্যের আলো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে আরও দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেন, শীত মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা বাড়ানো হবে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যমান শীতের তীব্রতার তুলনায় সহায়তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। দ্রুত আরও কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। শীতে বিপর্যস্ত রংপুর অঞ্চলের মানুষ এখন প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের কার্যকর সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে।
সিএ/এএ


