নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও বছরের প্রথম দিনে মাধ্যমিক স্তরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পায়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পরিকল্পনা ছিল, বছরের প্রথম দিনেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে অন্তত এক থেকে দুটি পাঠ্যবই তুলে দেওয়া। তবে বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির একটি বইও না পৌঁছানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির বই আংশিকভাবে এলেও মাঝের শ্রেণিগুলোর বই না থাকায় শিক্ষার্থীদের নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই বিতরণে এবার কোনো বড় ধরনের সংকট দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক স্তরের শতভাগ পাঠ্যবই আরও দুই সপ্তাহ আগেই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিনেই সব পাঠ্যবই হাতে পেয়েছে। যদিও কোনো কোনো বিদ্যালয়ে, যেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তর রয়েছে, সেখানে আজ বৃহস্পতিবার প্রাথমিকের বই বিতরণ হয়নি বলে একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থী আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই পেয়ে যাবে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই সময়সীমা আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন বই হাতে না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে, যা শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, পাঠ্যবই দেরিতে পেলেও শিক্ষার্থীরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সব বইয়ের অনলাইন সংস্করণ এনসিটিবির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আগ্রহীরা চাইলে সেখান থেকে বই ডাউনলোড করে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারবে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়িসহ) মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি। গত ৩১ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত এর মধ্যে ৭২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছেছে। ইবতেদায়ি স্তর বাদ দিয়ে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই সরবরাহের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ৮০ শতাংশের বেশি বই বিতরণ করা হলেও সপ্তম শ্রেণিতে গেছে মাত্র ৫৮ শতাংশের কিছু বেশি, অষ্টম শ্রেণিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং নবম শ্রেণিতে সরবরাহ হয়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ বই।
আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আরও কিছু বই সরবরাহ করা হয়েছে। এনসিটিবির হিসাবে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি ৬৯ লাখ বই, যা মোটের ওপর ৮২ শতাংশের বেশি।
রাজধানীর নিউ ইস্কাটন এলাকার প্রভাতী উচ্চ বিদ্যানিকেতনে গিয়ে দেখা যায়, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির সব বই পাওয়া গেছে এবং নবম শ্রেণির বেশির ভাগ বই এসেছে। তবে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির কোনো বই এখনো বিদ্যালয়ে পৌঁছায়নি। একই চিত্র দেখা গেছে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয়েও। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জানান, প্রাথমিক স্তর ও ষষ্ঠ শ্রেণির সব বই এসেছে, নবম শ্রেণির প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বই পাওয়া গেছে, কিন্তু সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই এখনো আসেনি।
রমনা থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, তাদের অধীনে থাকা ২৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণির বই সম্পূর্ণ এসেছে। সপ্তম শ্রেণিতে কেবল বাংলা বিষয়ের বই আংশিক এসেছে এবং অষ্টম শ্রেণির বই ধাপে ধাপে নামানো হচ্ছে। এদিকে মাদ্রাসার ইবতেদায়ি স্তরের বইয়ে কোনো সমস্যা না থাকলেও দাখিল স্তরের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই এখনো আসেনি বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক স্তরের বিষয়ে এনসিটিবি জানিয়েছে, নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য মোট ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি পাঠ্যবই প্রস্তুত ও সরবরাহ করা হয়েছে, যা শতভাগ বিতরণ সম্ভব হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আগের মতো বড় আয়োজন করে বই উৎসব না হলেও বিদ্যালয়ে বই পৌঁছে দিয়ে সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার ঢাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বইয়ের মান আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।
সিএ/টিআর


