বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করার জন্য রক্তস্বাক্ষর দিয়েছেন। জাতি চিরদিন তাদের এই অবদান স্মরণ রাখবে। তবে স্বৈরশাসনের পতনের পর শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরে গিয়ে লেখাপড়ায় মনোযোগী হবার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। গত ১৬ মাসে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসেনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব সন্ত্রাস, মারামারি ও হানাহানির কারণে শিক্ষার মান আজ খুবই নিম্নস্তরে। বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই আন্দোলনে লিপ্ত। এক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। পরীক্ষার বদলে অটোপাস এবং সচিবালয় ঘেরাও করা এখন নিয়মিত ঘটনা। শিক্ষকদের অপসারণের জন্যও মব ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম এখন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি মবের শিকার হয়েছেন। শিক্ষকদের অপমান, তিরস্কার ও জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা এখনো চলছে। মন্ত্রণালয় এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার কথা বললেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শিক্ষকদের লাগাতার মর্যাদাহানির প্রভাব দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘকাল থাকবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মব সহিংসতা শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার প্রতিফলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিনকে মব ও হুমকির মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেওয়া ডিনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রশাসন তাদের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে কিছু শিক্ষার্থী ‘আওয়ামীপন্থী শিক্ষক’ আখ্যা দিয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। ডিনদের রুটিন দায়িত্ব পালনে অপারগতা দেখানোর প্রেক্ষিতে উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে তারা লিখিতভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা শুধু অনন্য নয়; গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের লাঞ্ছনা, জোরপূর্বক পদত্যাগ, মারধর এবং মামলা-প্রক্রিয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি হাজি তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কান্তি লাল আচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত আছে।
কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এমনও রয়েছেন, যারা চাকরিতে থাকলেও ক্লাস নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে মব তৈরি করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮০০ শিক্ষক চাকরি ফিরে পেতে আদালতে গেছেন। শুধু ঢাকা শহরে দুই শতাধিক শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, যারা এখনও বেতন পাচ্ছেন না।
এছাড়া, ২৬ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়া খাগান এলাকায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায় অন্তত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ১,৭৮৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এইসব ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সিএ/এএ


