হিমালয়ের রহস্যেঘেরা এক ভয়ংকর পাহারাদার

ইয়েতি: কি বলবো একে? মানব! দানব নাকি ভাল্লুক…. যে হিমালয়কে একরকম আগলে রেখেছে। যে পাহারাদারের বেশেই হোক আর মানব দানবেএ বেশেই হোক।।

26

ইয়েতি

রহস্যের বেড়াজাল ভেদ করে সত্যটাকে সামনে এনে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে মানুষ বরাবরই একটু বেশীই আগ্রহী। সেই প্রক্ষাপটে আদিকাল থেকেই একের পর এক রহস্যের সমাধান করলেও প্রকৃতি যেন ক্লান্ত হয়নি, বরং ছুড়ে দিয়েছে বারেবারে নতুন কোনো রহস্য আর বিস্ময়। আর যদি তা হয় বরফে ঘেরা হিমালয়, তাহলে তো রহস্যে ঢুবি ঢুবি অবস্থা। তেমনি এক রহস্যময় প্রাণীর নাম ইয়েতি কিংবা পাথুরে ভাল্লুক অথবা মানুষখেকো।

হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে পাড়ি দিবে আর ইয়েতির কথা শুনবে না! তা কি হয়? সে হোক গাইড কিংবা স্থানীয় জনগণ, ইয়েতির কথা আর ভয় তাদের মুখে মুখে। 

ইয়েতি! দেখতে ভাল্লুকের মতো মনে হলেও।৷ আদৌ যে এরা ভাল্লুক তা নিয়ে আছে সংশ য়

লোকমুখে কিছু বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, ইয়েতি দেখলে মৃত্যু অনিবার্য। যদিও অস্তিত্বের প্রশ্নের উত্তরে প্রত্যক্ষ শক্ত কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি এখনো, তবুও ইয়েতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে অনেক বই-পুস্তক আর সিনেমা। কে জানে, হয়তো বরফে ঘেরা হিমালয়ের বন্ধুর পাথুরে-বরফের গুহাবাসী হয়ে আজো লুকিয়ে আছে এই প্রাণী। আবার হতেও পারে সবকিছুই ভ্রান্ত ধারণা বা কল্পনা সৃষ্টি কিংবা প্রাচীন লোকগাঁথা।

ইয়েতির পরিচিতি:—-

ইয়েতিদের একেক জায়গায় একেক নামে চিহ্নিত করা হলেও মূলত সবগুলো নামই ভাল্লুকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এলাকাভেদে তাদের নামগুলো হলোঃ Miche, Dzu-Teh, Migoi, Mi-go, Kang Admi, JoBran। ইয়েতি নামটি এসেছে তিব্বতি ভাষা থেকে যার বাংলা অর্থ পাথুরে ভাল্লুক। স্থানীয় হিমালয়ের মানুষরা বলতো এরা সারাক্ষণই পাথরের অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা করত এবং মুখ দিয়ে এক প্রকার শব্দ করত। এই পাথুরে অস্ত্র বহন করতো মূলত তাদের শিকারকে হতাহত করার জন্য অথবা আত্মরক্ষার জন্য। আর এই পাথুরে অশ্র থেকেই ‘পাথুরে ভাল্লুক’ নামে পরিচিত হয়ে যায়।

ইয়েতি শব্দটিও “মেতির” অপভ্রংশ যার অর্থ ভাল্লুক। ইয়েতি নামখানা জনপ্রিয় হলেও এদের অন্যান্য নাম আর নামের অর্থ গুলো হলোঃ মেহতেহ – মানুষরূপী ভাল্লুক, মি গো – বন্য মানুষ, ক্যাং আদমি – তুষার মানব, জোব্রান।।

সে ইয়েতি নাম হোক কিংবা তুষার মানব অথবা মানুষখেকো, এদের অস্তিত্ব এখনো পৃথিবীতে জোরদারভাবে অপ্রমাণিত। রহস্য ভেদ করে হয়তো একদিন বিজ্ঞানীরা খুঁজে পাবে এমন কোন চাঞ্চল্যকর তথ্য যার মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে ইয়েতি নামের নতুন প্রজাতির বাস্তবতা থাকবে এবং সবাই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে। 

শারীরিক অবয়ব:—-

স্থানীয় লোকজন কিংবা পর্বতারোহী নানাজনের মতের ভিত্তিতে এদের বাহ্যিক শারীরিক কাঠামো সম্পর্কে যা জানা যায় তা অনেকটা এমন যে বিশালদেহী প্রায় সাত থেকে দশ ফুট উচ্চতার অধিকারী এমন একজন যার ওজন আনুমানিক ৫০০ পাউন্ড হবে। আবার সারা শরীর লোমে আবৃত খালি গায়ে চলাফেরা করে, এরা মানুষের মতো হাঁটতে পারে সাথে লম্বা হাতেরও অধিকারী। আশ্চর্যের বিষয় হলো এদের পায়ের ছাপ প্রায় ১৬ থেকে ২৫ ইঞ্চি লম্বা বলে দাবি করেন অনেকে। অনেকের মতে এই প্রাণী নিম্নচাপ বা অধিক তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে না বলেই এদের শুধুমাত্র বরফঢাকা একালা যেমন মাউন্ট এভারেস্টের মত দুর্গম গিরি অঞ্চলগুলোতে তাদেরকে দেখা যায়। 

ইয়েতিদের বেঁচে থাকার উপাদান হিসেবে অনেকে জানান ওখানকার বিভিন্ন উদ্ভিদ সাথে জীবজন্তু শিকার করে ক্ষুধা নিবারন করে। আবার স্থানীয় গৃহপালিত পশুদেরও খাবারের জন্য ধরে নিয়ে যায় বলে জানা যায়।

তবে বাহ্যিক অবয়ব এর বর্ণনা পাওয়া গেলেও তা বিজ্ঞানীরা এখনো সত্য বলে স্বীকার করে নেয়নি, তার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আরও বিস্তারিত ও শক্ত প্রমানের অপেক্ষায় রয়েছে গবেষকেরা। 

ইয়েতি ধারণা কি শুধুই লোকগাঁথা?

ইয়েতির কথা সবচেয়ে বেশি নেপালে শোনা গেলেও এর অস্তিত্বের শক্ত কোনো প্রমাণ পায়নি কেউই। মূলত ধারণা করা হয় এরা নেপালের কোন আদিবাসী নয় বরং তিব্বতের বিস্তৃত  মালভূমি আর বিশালদেহী পর্বতসমূহ বসবাসকারী কিছু গোত্রের লোককথার চরিত্রবিশেষ। 

তারা যখন নানা গিরিখাত পার হয়ে অনেক আগেই হিমালয় এসে নেপালে বসবাস স্থাপন করে, তার সাথেই তারা বহন করে আনে তাদের লোকগাঁথা, সংস্কৃতি এবং ইয়েতির মতো গাঁ কাঁপানো গল্পগুলো। খানিকটা বন মানুষের মতো দেখতে এই প্রাণীকে অনেকগুলো সম্প্রদায় বর্তমান সময়েও পুজো করে থাকে। 

এই তিব্বতবাসীরা বিশ্বাস করে ইয়েতি যদি কেউ স্বচক্ষে দেখে থাকে তাহলে তার মৃত্যু অনিবার্য। এই বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝে এই প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক যে ইয়েতি কি আদৌ লোকগাঁথার কোন গল্প বা চরিত্র? কিংবা কাল্পনিক কোনো ধারণা? নাকি এমন কোন রুপকথার ভয়ানক গল্প যা দ্বারা শিশুকে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানোর হয়।

ইয়েতিদের অস্তিত্ব খোঁজার ইতিহাস:—

সময়টা ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দ। সমতলের মানুষদের কাছে যেমন প্রথমবারের মতো ইয়েতির ব্যাপারে খবর পৌঁছানো হয়, তেমনি সারা বিশ্বে আগ্রহী বিষয় হয়ে উঠে ইয়েতি। আর এই বিষয়ের মূল অবদান যার তিনি হলেন নেপালের প্রথম ব্রিটিশ প্রেসিডেন্ট বি. এইচ. হার্ডসনের। তিনি মূলত প্রথম ব্যাক্তি যিনি বর্ণনা দেন যে হিমালয় এমন এক প্রাণীর দেখা পান, যে প্রাণীটা সোজা হেঁটে চলে, সারা শরীরে লোম বা চুলে ঢাকা এবং লেজবিহীন। যদিও সে সময়ে তার বর্ণনার আশানুরূপ আলোড়ন সৃষ্টি করতে বা বেশীদিন টিনতে পারেনি। 

পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে অর্থাৎ ১৯৮৮ সালে লরেন্স ওয়েডেল নামক এক অভিযাত্রী বর্ণনায় সারা বিশ্বে পুনরায় এক জমজমাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তিনি ইয়েতির পায়ের ছাপ ও দেখতে পেরেছিলেন বলেও দাবি করেন এবং তিনি জানান তাঁর অভিযান সহযোগী গাইডের কাছেও ইয়েতির পায়ের ছাপ সম্পর্কে তিনি শুনেছিলেন। তবে এই পায়ের ছাপ আদৌ তুষার মানবের ছিল কিনা সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। 

এরপর ১৯১৩ সালে মোটামুটি একটা সুস্পষ্ট ধারণা মিলে একদল চৈনিক শিকারের কাছ থেকে। তাদের দাবি ছিল তারা শিকার করার সময় তুষার আচ্ছাদিত অঞ্চলে বানরের ন্যায় কাদাকার থ্যাবড়া মুখাকৃতি, সারা শরীরে কয়েক ইঞ্চি লম্বা রুপালি হলদে চুল এবং মানুষের মতো হাঁটাচলা করে এমন এক অসাধারণ শক্তির অধিকারী প্রাণীকে দেখেছিলেন। প্রানীটির আকার দেখেই তারা শক্তির আন্দাজ করেছেন।

১৯২১ সালে তুষার শৃঙ্গের মাত্র ৭৮৬ ফুট নিচে অবস্থিত রংবুক নামক জায়গায় বিশাল আকার পায়ের ছাপ পাওয়া যায়  কর্নেল সি. কে. হার্ডওয়ার্ড বেরির নেতৃত্বে একদল অভিযাত্রি তব্বতের মধ্য দিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ হাজার ফুট উপরে এই বিশালাকার পায়ের ছাপের দেখা পায়। এই এলাকা ২৬৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এলাকাটি অশান্ত ও রহস্যময় স্থান নামেও পরিচিত। 

১৯২২ সালের দিকে বেশ ক’জন পর্বতারোহী একই স্থানে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই দলে আলেকজান্ডার কিউলিস নামের একজন ডাক্তার ছিলেন তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায় এবং অসুস্থের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে তিনি এক লোমশ দানবের কথা বলেছিলেন। 

১৯২৩ সালে এভারেস্ট অভিযাত্রী ব্রিটিশ মেজর অ্যালেন ক্যামেরন জানান, হিমালয়ের হিমরেখার ঊর্ধ্বে খাড়া শৈল প্রাচীরের গা ঘেঁষে সংকীর্ণ পথে একদল মানবাকৃতি প্রাণী কে দেখেছিলেন যারা অল্প গতিতে চলছিল। 

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের রয়াল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটির সদস্য ও আলোকচিত্রী এম. এ. তোশবাজি এমন এক ছবি প্রকাশ করেন যাতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিলো মানুষ আকৃতির এমন একজন যে কুজো হাঁটছে। তিনি জানান তুষারের বিপরীতে তাকে কালো এবং ঝাপসা দেখাচ্ছিলো এবং তার পরনে কোন কাপড় ছিলনা।

পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে তিব্বতের ১৪০০০ ফুট উঁচুতে এই প্রাণীটির পদচিহ্ন পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী ফ্রাংকি স্মিদি। তিনি এই পদচিহ্নের মাপ নিয়ে দেখেন লম্বায় প্রায় ১৫ ইঞ্চি এবং চওড়ায় ৫ ইঞ্চি। 

এরপর ১৯৫০ সালে নেপালের একটি অঞ্চলে মমিকৃত একটি হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলির অস্থিসন্ধিসহ কিছু চামড়া পান। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ইয়েতি জাতির কোন প্রাণী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন সাথে বলেন এটি কোনো মানুষের হাতের আঙ্গুল। 

১৯৫১ সালে এরিক শিপটন নামের একজন আরোহী প্রায় ৫৫০০ মিটার উঁচুতে একটি পদচিহ্ন পান এবং তার ছবি তুলে নিয়ে আসেন সংবাদপত্র মাধ্যমে সেই পদচিহ্ন প্রকাশ হলে পৃথিবীতে আবারো একবার আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই পদচিহ্ন এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭ থেকে ৩০ ইঞ্চি এবং প্রস্থে প্রায় ১৩ ইঞ্চি। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলেও এই চিন্হ কৃত্রিম তৈরি হতে পারে না বলে জানান তারা। 

১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারি ও শেরেপা তেনজিং নোরগে জয় করলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। তারাও এটা স্বীকার করলেন যে যাত্রাপথে তারা অনেক বৃহদাকার পায়ের ছাপ দেখেছেন এই পায়ের ছাপগুলো মিলিয়ে তারা এগুলোকে কোনো মানুষের বানানো নয় বলেও দাবি করেন। আবার কোন প্রাণীর হতে পারে না বলে তাদের ধারণা। এই বিশাল আকার পায়ের ছাপের সাথে হাতের ছাপ না থাকায় এটা নিশ্চিত ভাবে তারা বলতে পারেন যে এই প্রাণী দুপায়ে হাঁটাচলা করেন অর্থাৎ সাধারণ কোন পরিচিত কোনো ভাল্লুক প্রজাতির প্রাণী নয় । 

আমেরিকান তথ্য অনুসন্ধানী ড. নরম্যান ডাইরেনফার্ম এবং অভিযাত্রী ম্যাকলানের কাছ থেকে ১৯৫৮ সালে পাওয়া গেল আরো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। তারা বলেন ইয়েতি নামের তুষার মানব আসলে নিম্নস্তরের এক ধরনের মানুষ বা মানুষ সাদৃশ্য প্রাণী। এরা হিমালয়ের নির্জন গুহায় বসবাস করে খুব একটা বাহিরে চলাফেরা করে না। তাদের সংগ্রহ করা বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে জানা যায় ইয়েতিদের দুটো প্রজাতির মঅধ্যে একটি প্রায় ৮ ফুট উচ্চতার অধিকারী এবং অন্যটি সর্বোচ্চ ৪ ফুট। 

১৯৭০ সালের ডন উলিয়ামসন ও তার গাইড শেরেপা রাতে ক্যাম্পে থাকাকালীন এক বিশাল দু’পায়ে জন্তুকে তাদের ক্যাম্পের আশেপাশে ঘুরতে দেখেছেন যার বিশাল আকার তা দেখে ইয়েতির কথাই মনে পড়ে তাদের। পরদিন তারা বাইনোকুলার দিয়ে দেখতে পায় এমন একটা প্রাণী বিশালদেহী প্রাণী যা প্রায় ২০ মিনিট ধরে ঘোরাফেরা করছিল তাদের ধারণা ওই প্রাণীটি খাবারের সন্ধানে হাঁটাহাঁটি করছিল। 

পরবর্তীতে ২০০৭ সালে এই রহস্য উদঘাটনের জন্য আমেরিকান টিভি উপস্থাপক এর একটি দল চলে যায় নেপালে সেখানকার তারা একটি পায়ের ছাপ পায় যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৩০ সেন্টিমিটার ও ২৫ সেন্টিমিটার। তারপর আরো অনেকগুলো পায়ের ছাপ পেয়ে সবগুলো ছাপ একের পর এক মিলিয়ে তারা এটা প্রমাণ করে এই ছাপগুলো নিখুঁত কোন প্রাণীর ছাপ। 

কিংবদন্তি পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনারসহ কয়েকজন বিশ্ব বিখ্যাত পর্বত আরোহী বড় বড় চুলের এক ধরনের বানরের মুখোমুখি হয়ে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন বলেও জানায়।

ইয়েতির অস্তিত্বের প্রশ্নে এখনো পর্যন্ত সকল প্রমানই কোনো শক্ত ভিত তৈরি করতে না পারলেও এদের অস্তিত্ব অস্বীকার না করতে বিজ্ঞানীদের দ্বিধার মধ্যে অবশ্যই ফেলতে পেরেছে। 

ইয়েতি নিয়ে যত গবেষণা:—-

সারা পৃথিবীতে একের পর এক যখন প্রমাণ মিলেই চলেছে ইয়েতির পক্ষ-বিপক্ষে, তখন বিজ্ঞানীরাও থেমে নেই। বিজ্ঞান ও নেমে পড়েছে তাদের অস্তিত্বের প্রশ্নের জবাব দিতে নানা গবেষণা আর প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া না গেলেও যেসব গবেষণা ইতোমধ্যে চলছে তা ধীরে ধীরে উল্লেখ করা হলো। 

ইয়েতির অস্তিত্বের প্রশ্নে প্রথম প্রশ্নটি আসে কী বা কোথা হতে এই প্রাণীর উৎপত্তি? তার রহস্য প্রায়ই উদ্ধার করেছেন বলে জানায় অনেকে। জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে ইয়েতির অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে বিজ্ঞানীদের একটি দল তারা পরীক্ষা করে জানান প্রাচীন মেরু ভাল্লুক বা পোলার বিয়ার ও বাদামি ভাল্লুকের যৌথ মিলবন্ধন রয়েছে এই প্রাণীর মধ্যে। ইয়েতির চুল সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করে জানা যায় প্রায় এক লাখ বছর বা তার পূর্বের পোলার বিয়ার এর সাদৃশ্য পাওয়া যায় এতে বছরের-পর-বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান জেনেটিক্সের অধ্যাপক ব্রিয়ান সিকেস এই গবেষণা চলতে থাকে, এখনো বিদ্যমান তার মত অনুসারে ঐ চুলে প্রাচীন পোলার বিয়ার বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলেও তা এখনো এভারেস্টে ঘুরছে কিনা তা জানা যায়না। 

তিনি জানান উপপ্রজাতিক বাদামী ভাল্লুক হিমালয়ের উপরে থাকতে পারে মেরু ভাল্লুক ও বাদামি ভাল্লুকের সংকর জাতও হতে পারে এই প্রজাতির ভাল্লুক। অধ্যাপক সিকেস হিমালয়ের গ্রাম্য এলাকায় স্থানীয়দের কাছ থেকে ইয়েতি নামে পরিচিত দুটি প্রাণীর চুলের নমুনা পরীক্ষা করেন এবং তা ডাটাবেজের অন্যান্য জোনেমের সাথে তুলনা করে দেখতে পেয়েছেন তা প্রাচীন মেরু ভালুকের চোয়ালের হাড়ের সাথে হুবহু মিল  যা নরওয়ের স্বালবার্ড এ পাওয়া যায় । 

এছাড়াও ইয়েতি বলে দাবি করা হয়েছে এমন ৯টি নমুনার জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে জানান ৯টির মধ্যে প্রায় সবকটি ভাল্লুকের প্রজাতির। তার মধ্যে ৫টি  তিব্বতি বাদামি ভালুক, ২টি হিমালয়ের বাদামী ভাল্লুক, এবং একটি এশিয়ার কালো ভাল্লুকের সাথে সনাক্ত করা হয়। 

২০১৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেসিস্টদের চালানো গবেষণায় দাবি করা হয় ইয়েতি নমুনার সাথে প্রাগৈতিহাসিক মেরু ভাল্লুকের জিনের মিল রয়েছে। 

প্রায় ৩ বছর পর শার্লট লিন্ডভিস্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় নতুনভাবে আলোকপাত করেন এবং রবার্ট সাইকোর সাথে ব্রিটিশ টিভি প্রোডাকশন কোম্পানির আহবানে এই গবেষণা নিয়ে টিভি সিরিজ তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালে তার গবেষণা কাজের উপর নির্মিত তথ্যচিত্র “Yeti or Not” প্রচারিত হয়।

নতুন তার এই গবেষণার মাধ্যমে তিনি দাবি করেন পূর্বে করা অধ্যাপক সিকেস এর গবেষণায় কিছুটা ভুল রয়েছে। তার তথ্যানুসারে  প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ বছর আগে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় থেকে নেমে আসা একদল বাদামি ভালুক থেকে হিমালয়ের বাদামি ভালুক আলাদা হয়ে যায়। অন্যদিকে তিব্বতের বাদামী ভাল্লুক প্রজাতির উদ্ভব হয় মূলত সাড়ে ৩ লক্ষ বছর আগে। 

তিনি আরো জানান হিমালয়ের বাদামী ভাল্লুক অতীতের বাদামী ভাল্লুক এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত এই দুটি প্রজাতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে, হিমালয়ের দুর্গমতাই তাদের মিশতে দেয়নি। তিনি এই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী রক্ষায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

গবেষকদের যেমন গবেষণার ব্যস্ততার কোন কূল নেই প্রাণের অস্তিত্বের প্রশ্নে, তেমনই দিনদিন প্রাপ্ত সকল ছোট ছোট প্রমাণগুলো একের পর এক বিস্ময়কর তথ্য প্রদান করবে বলে তাদের ধারণা এবং অচিরেই এই প্রশ্নের সমাধান হবে। 

হিমালয়ে বৃহদাকার আর লোমে ঘেরা এই শক্তিশালী প্রানীটির অস্তিত্ব প্রমাণ একদিকে পৃথিবীতে একের পর এক আলোড়ন সৃষ্টি করছে অন্যদিকে ইয়েতির জন্তুটি আদৌ পৃথিবীতে আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই একেবারেই ফেলনা হিসেবে বিজ্ঞানীরা ফেলে দিতে পারছে না। 

আবার যারা ইয়েতি দেখেছে বলে দাবি করেছে তারাও জোর দিয়ে বলতে পারছে না যে তারা যে প্রাণী দেখেছে তা সেই কাঙ্ক্ষিত ইয়েতি প্রাণীই ছিল। তবে তাদের সংগৃহীত প্রমাণও বিজ্ঞানীরা সাজানো নাটক বলে বলতেও পারেনি। বহুল জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অচিরেই সমাধান আসবে বলে আশ্বাস গবেষকদের। 

ইয়েতি যদি সত্যিই থাকে তাহলে পৃথিবীর সামনে আসছে না কেন? পৃথিবীতে তাদের নিয়ে যত বিশ্বাস, গল্প আর অবিশ্বাস তা ই বা শেষ হচ্ছে না কেন? এইসব রহস্যের অবসান অবশ্যই ঘটবে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এ পর্যন্ত ইয়েতির কোন প্রকার মরদেহ কিংবা ভগ্নাবশেষ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

লিখেছেন: আল জোবায়ের আলিম