অসময়ের গল্পঃ বাবার স্বপ্ন

21

অসময়ে বসে বসে বার্তা আদান প্রদান চলছিলো। সে সময়ে হঠাৎ এক অপরিচিতার বার্তায় বেজে উঠলো আমার মুঠোফোন। আলাপ চলছিলো।  চলতে চলতে একসময় তা রুপ নিলো গল্পে। মনে হচ্ছিলো কারো সাথে যেনো গল্পে মেতে উঠছি। সেই মুহুর্তে মনে হলো কোনো এক লেখকের লিখা গল্পের বইয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। অপরিচিতা বলছিলো তাদের বাবা মেয়ের কোয়ারান্টাইনের গল্প। বাবা বলতেছে মেয়েকে আমার অনেক স্বপ্ন ছিলো জানিস বড়ো ডাক্তার হবো। দেশের মানুষের সেবা করবো। গ্রামে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে গরীবদের সেবা করবো ফ্রিতে। আর আজ যদি ডাক্তার হতে পারতাম তাহলে এই দুঃসময়ে কতো মানুষকে না সেবা দিতে পারতাম। বাবা মেয়েকে বলতেছে জানিস মা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জম্মালে নাকি সবকিছু চাওয়া কিংবা পাওয়া যায় না। তাদের জন্য স্বপ্ন দেখা মানা। আর আমার সে পরিবারে জন্ম নিয়ে একটি না হতে না পারার অনুসূচনা কাজ করে। অপরিচিতা মেয়েটির বাবা নাকি ছোটকাল থেকে অনেক মেধাবী ছিলো। আর মেধাবী ছিলো বলে ডাক্তার হওয়ার বাসনা জেগেছিলো মনে। সবসময় স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। আস্তে আস্তে তার বাবার স্বপ্ন পূরণের সময় ঘনিয়ে আসছে। এইচ, এস. সি. পরীক্ষার সময় হয়ে আসলো। নব্বই দশকে যাকে বলতো আই এ পরীক্ষা। পরীক্ষা দিলো, ভালো রেজাল্টও করলো। এখন পালা তার স্বপ্ন পূরণের পড়তে লাগলো মেডিকেলের জন্য। তার চোখে শুধু এখন মেডিকেল ছাড়া আর কিছু দেখে না। মাথায় একটি শব্দ ডাক্তার।কিন্তু, দূর্ভাগ্য ওই যে আমরা যেটা বলি নিম্ন-মধ্যবিত্তদের নাকি সব স্বপ্ন দেখতে নেই। স্বপ্ন দেখতে নাকি টাকা লাগে। এখানে তাই হলো। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করা হলো। শহরে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু শহরে যাওয়ার মতো তার কাছে কোনো অর্থ নাই। কি করবে কিরবে তা ভেবে হতাশ। মনে কিছুটা হতাশার বাসা বাঁধলো। কিন্তু ভাগ্যের দোহায় দিয়ে কি করবে ভেবে না পেয়ে ভর্তি হতে হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারে একটি কলেজে। কিন্তু তারপর স্বপ্ন দেখা থামেনি তার। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন তখনো মাথায় ঘুরে। আবার, মনে মনে এটাও ভেবে চলে স্বপ্ন দেখতে নেই মানা। পড়াশোনা শেষ করলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ওই কলেজ থেকেই। তারপর শুরু হলো চাকরির বাজারে দৌড়াদৌড়ি। জীবন চলছে চলবে। থেমে নেই স্বপ্ন দেখা। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা। অনেক দৌড়াদৌড়ির পর একটা চাকরিতে নিজেকে যুক্ত করে নিলো। চাকরিতে ঢুকার কিছুদিন পর নিজেকে বিবাহ নামক কথাটার বন্ধনে আবদ্ধ করলো। শুরু হলো তার নতুন জীবন সাংসারিক জীবন। তার মাথায় এখনো মেডিকেলের স্বপ্ন ঘুরে। সাংসারিক জীবনের কয়েক বছরের মধ্যে জম্ম নিলো ফুটফুটে এক কন্য সন্তান। তাকে নিয়ে সাংসারিক জীবন চলছে। আস্তে আস্তে মেয়ে বড়ো হচ্ছে। স্কুলে ভর্তি করা হলো মেয়েকে। এখানে বলে রাখি শুরুতে যে অপরিচিতার কথা বলছি সেই মেয়েটি এই ফুটফুটে মেয়েটি। এখন তাকে ঘিরেই বাবার স্বপ্ন। মেয়ে বড়ো হতে লাগলো। বাবার মতো অনেক মেধাবী পড়ালেখায়। সব কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট। বাবার স্বপ্ন আরো বেশি জোড়ালো হতে লাগলো। তার স্বপ্ন এখন মেয়ে ডাক্তার হবে। দেশের সেবা করবে। সে যেটা পারেনি তার মেয়েকে দিয়ে সেটা পূরণ করবে। সে এখন মেয়ের চোখে মুখে ডাক্তারের প্রতিচ্ছবি দেখে। মেয়ে মেট্রিক পরীক্ষা অর্থাৎ এস.এস.সি. পরীক্ষার সময় হলো। পরীক্ষা শুরু হলো। হঠাৎ করে কি যেনো হলো মেয়ের অনেক অসুখ। বাবার মনে তার মেয়েকে নিয়ে দেখা নিজের স্বপ্নটার এই বুঝি আবার টান পড়লো। কিন্তু অসুস্থতা নিয়ে পরীক্ষা দিলো। রেজাল্টের দিন আসলো। অপরিচিতার মনে আশা ছিলো ভালো রেজাল্ট হবে। কিন্তু হলো না। কয়েকটা বিষয়ে খারাপ আসলো। এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না। মেডিকেলে পরীক্ষা দিতে হলে ভালো রেজাল্ট তো লাগবেই। বাবা মেয়েকে বললো হতাশ হইও না মা তুমি আবার ভালো করে প্রিপারেশন নাও, তুমি পরবর্তী বছর আবার পরীক্ষা দিবে। আমার বিশ্বাস তুমি ভালো রেজাল্ট করবে। পরবর্তী বছর পরীক্ষা দিলো ভালো রেজাল্ট করলো। বাবার মনে আবার মেয়ের মাঝে নিজের স্বপ্নকে খুঁজে পেলো। মেয়েকে বাবা তখন বলছে তুই একদিন ডাক্তার হবি। দেশের সেবা করবি। গ্রামে গিয়ে গরীবদের প্রতি সপ্তাহে ফ্রি চিকিৎসা করবি। এখন মেয়েটি কলেজে পড়ছে। নিজেও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে। বাবার স্বপ্ন হওয়ার জন্য সবসময় নিজেকে প্রস্তুত করে যাচ্ছে। বাবারও আশায় আশায় দিন কাটছে কখন তার স্বপ্নের ইতি ঘটবে, ঘরে একজন ডাক্তার আসবে তা নিয়ে। এরকম প্রতিটি বাবার স্বপ্ন পূরণ হোক এই আশা নিয়ে শেষ করছি আমার এই অসময়ের গল্পটি। সুস্থ থাকুক পৃথিবীর সকল মা বাবা।

গল্পটি লিখেছেনঃ নাছির উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here