উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি মুসলিম চিকিৎসক জোহরা বেগমের জন্মদিন আজ

11

প্রেমহীন, ভালোবাসাহীন সংস্কারের কর্কট ব্যাধিতে ১৯ শতকের বাঙালি সমাজ গিয়েছিলো ঝাঁঝড়া হয়ে। ভালোবাসার উর্বর বেলাভূমিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলো বিভেদের কন্টকময় ক্যাকটাস। পূর্ণিমার চাঁদের পরে যেমন সকালের সূর্য ওঠে ঠিক তেমন ভাবেই ১৯ শতকের শুরুতে বাঙালি সমাজে সূর্য হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা তথা উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক জোহরা বেগম কাজী।
অবিভক্ত ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজনান গ্রামে ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর এই মহীয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেন৷ তার পিতার নাম ডাক্তার কাজী আব্দুস সাত্তার ও মায়ের নাম মোসাম্মদ আঞ্জুমান নেসা। তার আদি পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার গোপালপুর গ্রামে। তিনি ১৯২৯ সালে আলিগড় মুসলিম মহিলা স্কুল থেকে প্রথম বাঙালি মুসলিম আলিগড়িয়ান হিসাবে এসএসসি পাশ করেন। ২৩ বছর বয়সেই তিনি দিল্লীর ‘লেডি হাডিং মেডিক্যাল কলেজ’ থেকে ১৯৩৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমবিবিএস পাস করেন৷ এজন্য পুরস্কার হিসেবে পান ভাইসরয় পদক।
১৯৩৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করার পর জোহরা বেগম কাজী কর্মজীবনে প্রবেশ করেন৷ তিনি প্রথমে ইয়োথমাল ওয়েমেন্স (পাবলিক) হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে যোগদেন৷ এরপর বিলাসপুর সরকারি হাসপাতালে যোগ দেন৷ পরবর্তীকালে মানুষের সেবার জন্য মহাত্মা গান্ধী নির্মাণ করেন সেবাগ্রাম৷ এই সেবাগ্রামে অবৈতনিকভাবে কাজ করেন জোহরা বেগম কাজী৷ এছাড়াও তিনি ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডাক্তার হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন৷ ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দেন৷ ঢামেক হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় অবসর সময়ে তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অনারারি কর্ণেল হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন৷ মিডফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢামেক হাসপাতালে তিনি গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান এবং অনারারি প্রফেসর ছিলেন৷ ১৯৭৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর বেশ কিছু বছর হলিফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালে কনসালটেন্ট হিসাবে চিকিৎসা সেবাপ্রদান করেন৷ পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেলে অনারারি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন৷
ঢামেক হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার সময় নারী রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কুসংস্কার তাকে আহত করে। তিনি তাদের সাথে সরাসরি কথা বলে তাদের ভুল ধারণা দূর করতেন। তার কারণে পরবর্তীতে চিকিৎসাশাস্ত্রে এদেশে মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়।
চিকিৎসাক্ষেত্রে ও সমাজের বিভিন্ন কাজে এই অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কারেও ভূষিত হন। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো: তখমা-ই-পাকিস্তানি (১৯৬৪), বেগম রোকেয়া পদক (২০০২) ও একুশে পদক (২০০৮)
২০০৭ সালে ৭ নভেম্বর ঢাকাতেই এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে। বিগত কয়েক বছর ধরে সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগল তার জন্মদিনে বিশেষ ডুডল প্রকাশ করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। এই অনন্য ও অসাধারণ মানুষটির জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লিখেছেন : ফারজানা ফারজু