চট্টগ্রামে ‘তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন’ প্রতিষ্ঠা

চট্টগ্রামে 'তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন' প্রতিষ্ঠা এবং ওস্তাদ রমনী মোহন দাশের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন

71

ইভান পাল ।।

প্রকৃতির রাজ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে মেঘ গুড় গুড় বর্ষা৷ আষাঢ় এসেছে রুপসী বাংলার প্রকৃতিতে।। এরকমই একটি মেঘ গুড় গুড় বর্ষার দিনেই আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে অর্থাৎ ১৯২০ সালের ১৮ই জুন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জামালখানে জন্মেছিলেন চট্টলার সংগীত জগতের প্রাণপুরুষ ওস্তাদ রমনী মোহন দাশ

ওস্তাদ রমনী মোহন দাশ

শৈশবেই বাঁশি ও মৃদঙ্গ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী৷ পরে তবলা ও মৃদঙ্গ হয়ে ওঠে তাঁর সাধনার বিষয়। 

প্রখ্যাত তবলাবাদক ওস্তাদ শিবশংকর মিত্রের কাছে প্রথম হাতেখড়ি হয় রমনী মোহন দাশের। এরপর ১৯৫২ সালে সর্বজনপ্রিয় শ্রী জগদানন্দ বড়ুয়ার প্রতিষ্ঠিত গানের স্কুল এবং তৎকালীন মিউজিক ক্লাবের অর্কেস্ট্রা দলে তবলা শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। একি সাথে তাঁর তবলার পাঠও চলতে থাকে।

১৯৫৪ সালে চিটাগাং মিউজিক ক্লাবে তৎকালীন প্রখ্যাত তবলাবাদক কানাই লাল দাশ যোগদান করলে ওস্তাদ রমনী মোহন দাশ তাঁর কাছে তালিম নিতে থাকেন।

এরপর বাংলাদেশের একমাত্র সংগীত পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা ‘ধ্রুব পরিষদ’র সপ্তম বর্ষে বি মিউজিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং তাঁকে  ‘ছন্দরত্নাকর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।      

জগদানন্দ বড়ুয়ার অর্কেস্ট্রা দলে থাকাকালীন ১৯৫৩ সালে সেন্ট প্লাসিড গীর্জার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তিনি তবলা বাজিয়ে সকলকে মুগ্ধ করেন এবং ১৯৫৬ সালে বুদ্ধ জয়ন্তী ও বুদ্ধের আড়াই হাজার বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তিনি তবলা সংগত করে আবারো সকলকে বিমোহিত করেন।  

ওস্তাদজী শিল্পী নিকেতন, শ্বাশত ললিতকলা একাডেমি, অগ্রণী সংঘ ও সংগীত শিক্ষা কেন্দ্রে তবলার শিক্ষক হিসেবে কাজ করে প্রচুর সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। 

আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি স্নেহশীল ও সুদক্ষ শিক্ষক হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকেই আজ বেতার ও টেলিভিশন শিল্পী। 

ওস্তাদ রমনী মোহন দাশ মানুষ নিয়ে ভাবতেন, মানুষের মঙ্গলের কথা ভাবতেন, ছাত্রদের মঙ্গলের কথা ভাবতেন, ছাত্র-প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রদের কি করলে ভালো হবে তা নিয়েই সবসময়ই তাঁর মাথা ব্যাথা। সংগীতের সাথে এমনিতেও মানব মঙ্গল, প্রকৃতি বন্দনা ওতোপপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে। আর সবসময়ই তবলা। তালযন্ত্র নিয়ে ওস্তাদজীর প্রতি মূহুর্তের ভাবনা।

ওস্তাদজীর ভাষায় — ‘মানুষ-ছাত্র-তবলা’।। এই তিন শব্দই ওস্তাদজী বেশি বিশ্বাস করতেন। 

১৯৯২ সালে জন্মগ্রহণের ঠিক একি দিনেই অর্থাৎ ১৮ই জুন, ৭২ বছর বয়সে চট্টলার সংগীত জগতের প্রাণপুরুষ, এই গুণী শিল্পী, গুণী শিক্ষক ওস্তাদ রমনী মোহন দাশ পরলোক গমন করেন। 

ওস্তাদজীর জন্ম-মৃত্যুর এই দিনেই বিশেষ করে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর কথা মাথায় রেখে তাঁরই সুযোগ্য পুত্র, চট্টগ্রামের আরেক গুণী তবলা শিল্পী ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশ ও তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণাঢ্য আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল অনেক আগে থেকেই। 

ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশ।। বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে ধারণকৃত;

বিশেষ করে, এই দিনটিতেই প্রয়াত ওস্তাদ রমনীমোহন দাশের সুযোগ্য পুত্র সুদেব কুমার দাশের পরিচালনায়  “তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন” নামের একটি তবলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা ছিল। 

কিন্তু, বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস’র জন্য সমস্ত পরিকল্পনাই থমকে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান যুগ যেহেতু প্রযুক্তির যুগ, প্রযুক্তির কল্যাণে সবই সম্ভব। 

তাই, তালতীর্থ ও থামেনি। ওস্তাদ রমনী মোহন দাশের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন এবং তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন প্রতিষ্ঠার আয়োজন ভার্চুয়ালিই করা হয়। 

ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশ

১৮ জুন, বৃহস্পতিবার রাত ৯ টায় তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন – এর যে ফেসবুক পেইজটি রয়েছে তা থেকে সরাসরিভাবে সম্প্রচার করা হয় তালতীর্থ প্রতিষ্ঠা’র এবং ওস্তাদ রমনী মোহন দাশের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি।

প্রদীপ প্রজ্জ্বালন ও শ্রদ্ধা নিবেদন

অনুষ্ঠানের শুরুতেই তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন – এর প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক এবং ওস্তাদ রমনী মোহন দাশের সুযোগ্য পুত্র বিশিষ্ট তবলাশিল্পী ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা এক গুরুগম্ভীর পরিবেশে ওস্তাদ রমনী মোহন দাশের উদ্দেশ্যে প্রদীপ প্রজ্জ্বালন ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এর পরপরই তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন এর সদস্য এবং ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশের ছাত্র — অপরুপ চৌধুরী, অর্জন মল্লিক, জ্যোর্তিময় আচার্য্য, কনক বিশ্বাস একসাথে তাল-ছন্দ-লয়ে ত্রিতালের লহড়া পরিবেশন করে সকলকে মন্ত্র মুগ্ধ করেন। 

অপরুপ চৌধুরী, অর্জন মল্লিক, জ্যোর্তিময় আচার্য্য, কনক বিশ্বাস এর পরিবেশনা

লহড়ার পর পরই রাগ ভীম পলশ্রী’ র উচ্চাংগ সংগীতের গম্ভীরতায় অনুষ্ঠান মাতিয়ে তোলেন সংগীতশিল্পী পৃথুলা বিশ্বাস। আর তাকে তবলায় সহযোগীতা করেন কনক বিশ্বাস। 

পৃথুলা বিশ্বাস ও কনক বিশ্বাস ( তবলা)

অনুষ্ঠানে একক তবলা বাদনে ছিলেন— তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন এর সদস্য ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশের ছাত্র সুমন চৌধুরী, সঞ্জীত কুমার নাথ এবং বিশ্বজিৎ চৌধুরী।  

শ্রিয়া চৌধুরী এবং তবলায় অপরুপ চৌধুরী

অতিথিশিল্পী শ্রিয়া চৌধুরী উপমহাদেশের গুণী সংগীত শিল্পী হৈমন্তী শুক্লার রাগাশ্রয়ী গান ‘এখনো সারেঙ্গী টা বাজছে’ পরিবেশন করে অনুষ্ঠানটিকে অনন্যতার জায়গায় নিয়ে যায়। আর তার সাথে তবলায় সঙ্গত করেন, তালতীর্থেরই সদস্য অপরুপ চৌধুরী।। 

নৃত্যশিল্পী হিল্লোল দাশ ও সুরভি দাশ

অনুষ্ঠানে অতিথি শিল্পী হিসেবে নৃত্য পরিবেশন করেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী হিল্লোল দাশ ও সুরভী দাশ।   

সংগীতশিল্পী মিতালি রায়

অতিথি শিল্পী মিতালি রায়ের কন্ঠে উচ্চাংগ সঙ্গীতের ভূপালি রাগের একটি খেয়াল’র মূর্ছনায় অনুষ্ঠানের ইতি ঘটে। 

উত্তম কুমার দত্ত (সদস্য তালতীর্থ)

অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনা করেন তালতীর্থ’র ই সদস্য এবং ওস্তাদ সুদেব কুমার দাশের ছাত্র উত্তম কুমার দত্ত।।

ওস্তাদ রমনী মোহন দাশের জন্মশতবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকীতে চ্যানেল আগামী পরিবারের পক্ষ থেকে রইল শ্রদ্ধা এবং তালতীর্থ তবলা শিক্ষা ও শিল্পী নিকেতন এর জন্য রইল অনেক শুভকামনা।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here