একুশ শতকের সিল্ক রোডই ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’

ইউরেশিয়ায় চীনের প্রভাব, ভারতের উদ্বেগ!

58

‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’। বাংলায় যেটাকে ‘এক অঞ্চল, এক পথ ‘ বলা হয়। আর চীনা ভাষায় 一 ‘ই তাই ই লু ‘। এটি হচ্ছে— গণচীন সরকারের গৃহীত একটি উন্নয়ন কৌশল ও কাঠামো। যেটি ইংরেজিতে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নামেও পরিচিত।

চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং দ্বারা প্রস্তাবিত একটি কাঠামো। যার প্রধান দুটি উপাদান- ভূমি-ভিত্তিক রেশম পথ অর্থনৈতিক বলয় অর্থাৎ যাকে সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট বলা হয় এবং আরেকটা হচ্ছে, সামুদ্রিক রেশম পথ নিয়ে গঠিত অবশিষ্ট অংশ যা ইউরেশিয়ার ( ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোকে একত্রে ইউরেশিয়া বলা হয়) মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার উপর গুরুত্ত্ব দেয়।

২০১৩ সালে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ‘ নামে নব্য সিল্ক রোডের সূচনা করতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যখন থেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন থেকেই নানা তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করে এই বৃহত্তর ধারণাটি। 

চীনের এই কৌশল বিশ্বব্যাপী বিষয়সমূহে চীনের একটি বড় ভূমিকা নেওয়ার পথ সুগম করে। একইসাথে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন ইস্পাত উৎপাদন, চীনের অগ্রাধিকার ধারণক্ষমতা সহযোগিতার প্রয়োজন তুলে ধরে।

ইতোমধ্যেই অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এই মহাপরিকল্পনাটি। গৃহীত এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন যেমন অর্থনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী এবং বাণিজ্য খাতে আরো ডালাপালা ছড়াতে পারবে, ঠিক তেমনি এর অংশীদারী দেশগুলোর একদিকে যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে অন্যদিকে ব্যাপক পরিমাণে চীনা পণ্য ব্যবহারের সুবিধা উন্মোচিত হবে।  

চলুন, বেল্ট রোডকে কেন এই শতাব্দীর নব্য সিল্ক রোড বলা হয়, এবং এর উৎপত্তি সম্পর্কিত পেছনের গল্প শোনা যাক।

সিল্ক রোডের ইতিহাসঃ

চীনের “হান” সাম্রাজ্যের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সিল্করুট, যা চীনের সাথে পূর্ব-পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল সমূহের মধ্যে বাণিজ্যিক আদান-প্রদানসহ সাংস্কৃতিক, ধর্ম, বিজ্ঞান, শিল্পসাহিত্য আদান-প্রদানের জন্য ঐতিহাসিক এবং প্রাচীন দীর্ঘতম বাণিজ্য পথের একটি নেটওয়ার্ক। খ্রিস্টপূর্ব ১৩০ সাল থেকে ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত এ পথের অস্তিত্ব থাকে। 

সিল্ক রোড নামকরণের কারণঃ 

মূলত সিল্ক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই এই রোডের যাত্রা হয় বলে একে সিল্ক রোড নামে অভিহিত করা হয়। সিল্ক রোড কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রোড নয়। 

তখনকার সময়ে এশিয়ায় সিল্ক ব্যবসা অনেক লাভজনক ব্যবসায়ে পরিণত হয়। মূল্যবান বিলাসবহুল এই সিল্ক পণ্যেটি ব্যাপক আকর্ষণ করে তখনকার ব্যবসায়ীদের। ধীরে ধীরে এশিয়া ছেড়ে ইউরোপেও ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে, এই ব্যবসায়কে কেন্দ্র করে এই রোডের যাত্রা শুরু হয়। এই সিল্করোড মূলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের স্থলপথের সমষ্টি। তখনকার দিনে চীন রেশমের বিপরীতে স্বর্ণ, পশম, কাচের জিনিস, ঘোড়া ইত্যাদি ইউরোপ ও মধ্য এশিয়া হতে পেতে থাকত। ফলে চীনা বাণিজ্য ধীরে ধীরে জমজমাট হতে থাকে। পরবর্তীতে ১৪৫৩ সালে বিখ্যাত অটোমান সাম্রাজ্য চীনের সাথে বাণিজ্য বয়কটের পূর্ব পর্যন্ত সিল্ক রোডের অস্তিত্ব ছিল এরপর চীন এই রাস্তাকে বন্ধ করে দেয়। 

সিল্ক রোডের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ঃ

এই রুটের কল্যানে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও জাপান, কোরিয়া, ইরান, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য রমরমা হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচুর অন্তঃবিনিময় হয়। এছাড়াও ভাষা, দর্শন, স্থাপত্যকলারও বিনিময় হয় সিল্ক রোডের হাত ধরে। এতসব অন্তঃবিনিময়ের মাধ্যমেই প্রাচীন ঐতিহাসিক এই রোড আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন এবং উন্মুক্ত বাণিজ্যের রুপরেখা এঁকে যায়। তাছাড়া প্রাচীন সেই ভয়াবহ প্লেগ রোগ এই রোডের হাত দিয়েই ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

একুশ শতকের সিল্ক রোডই “বেল্ট রোড” 

 ১৪৫৩ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই পুরনো ঐতিহাসিক সিল্ক রোড কে পুনরুজ্জীবিত করতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যে উদ্যোগ হাতে নেন তাই মূলত “বেল্ট রোড” নামে পরিচিত। একে সিল্করোড ইকোনমিক বেল্ট বা “টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোড” নামেও পরিচিত। 

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খান যে সিল্ক রোডের  হাত ধরে একের পর এক ধ্বংস লীলা চালিয়েছিল সেই একই পথ ধরে বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং নব্য বেল্ট রোড সূচনা করেন। কিন্তু চেঙ্গিস খানের সেই ধ্বংসলীলার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং রেখে যাচ্ছেন রেললাইনের পাত এবং তেলের পাইপলাইন। 

এই বেল্ট রোডের মূলত উদ্দেশ্য হল এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ৬৫টি বা তারও বেশি দেশের সঙ্গে চীনের ভূখন্ডের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত যোগাযোগ মাধ্যম গড়ে তোলা। এতে স্থলপথ এর পাশাপাশি সমুদ্রপথ এবং তেল চলাচলের পাইপলাইনের উল্লেখ করা হয়। অন্তর্ভুক্ত এই ৬৫ টিরও বেশি দেশের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৭০ ভাগ, জ্বালানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ, পণ্য ও সার্ভিসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ  এবং পৃথিবীর মোট জিডিপির ২৮ ভাগই এর অন্তর্ভুক্ত। 

বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই চীনের অবস্থান। দিন দিন যে হারে চিন অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিকভাবে ডালাপালা ছড়াচ্ছে এবং চারপাশের দেশগুলোতে যেভাবে নিজের পণ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করছে তাতে এটা কল্পনা করাই যায় যে অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে পৃথিবীতে চীন রাজত্ব করবে। চীন মনে করে তার সামর্থ্যের মধ্যে আছে এমন আশেপাশের দেশগুলো প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ হলেও তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয় ফলে তারা উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশ থেকে উপরে উঠে আসতে পারছে না। তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি চীনা পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধিকরণ এবং প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক বিনিয়োগ করার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জন করায় চীনের লক্ষ্য। 

ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন সিল্ক রোডকে পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে বেল্ট রোডের যে ধারণা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উপস্থাপন করে তাতে মূলত দুইটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশ হলো সড়কপথে এশিয়া ও ইউরোপের সাথে যুক্ত হওয়া। তবে সড়ক পথে এশিয়া ও ইউরোপ এর সাথে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রেললাইন পথ এবং তেলের পাইপলাইনের পথের কথা উল্লেখ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। আবার দ্বিতীয় অংশটি হলো সমুদ্রপথ। যার মাধ্যমে চীন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সাথে সরাসরি সংযুক্ত হবে।

এই বেল্ট রোডের সম্পূর্ণ ধারণাটি মূলত ৬ টি অর্থনৈতিক করিডরের মধ্যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

করিডোরগুলো হলঃ 

  • নব্য ইউরেশিয়া বৃহত্তর সেতু, যা পশ্চিম চীন থেকে কাজাখস্তানের হাত ধরে রাশিয়ায় প্রবেশ করে। 
  • চীন – মঙ্গোলিয়া – রাশিয়া, যা চীনের উত্তরাংশ থেকে রাশিয়ার পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। 
  • চীন- মধ্যএশিয়া – পশ্চিমএশিয়া, যা চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত। 
  • চীন – ইন্দোচীন উপসাগর, যা চীনের দক্ষিনাংশ থেকে সিঙ্গাপুর প্রবেশ করবে।
  • চীন – পাকিস্তান, এটি চীন থেকে পাকিস্তানে প্রবেশ করবে সরাসরি। 
  • বাংলাদেশ – চীন – ভারত – মায়ানমার। যা বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মায়ানমারকে সংযুক্ত করবে।

তহবিল গঠন 

ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার এ বিশাল পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থার তহবিল কেমন হতে পারে তা আন্দাজ করাটা অবশ্যই অনেকটা কষ্টসাধ্য। পরিবহন, নেটওয়ার্ক, শক্তি ও অবকাঠামোর জন্য বিআরআই (বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ) ৮ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি  ব্যয় করবে বলে ধারণা দিয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের উৎস কি, তা জানা জরুরি।

এই অর্থ মূলত দুটি খাত থেকে আসবে প্রথমত, সিল্করোড তহবিল। দ্বিতীয়ত, এআইআইবি (এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক)। 

চীন ১৯১৩ সালে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিলে ৫৭টি দেশ সাড়া দেয়। এছাড়া বাংলাদেশ এই এআইআইবি এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এর কার্যক্রম চালু করা হয় ২০১৬ সালের ১৬ ই জানুয়ারি। এর সদর দপ্তর বেইজিংয়ে।

বাংলাদেশের কি লাভ হতে পারে এইসব ক’টা ঘটনায়? 

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশীদার হলো চীন। যোগাযোগ, রেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পানি, স্যানিটেশন, আইসিটি ও শিপিং ছাড়াও অনেক বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের প্রধান সহযোগী চীন। 

এই বিশাল বেল্টের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের কি কি লাভ হতে পারে —–

  • জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের আরো বেশি পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য, ভিশন ২০২১ এবং ২০৩১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ অতঃপর ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছানোর জন্য অবকাঠামোগত প্রচুর অগ্রগতি করতে হবে। এই বেল্ট রোডের হাত ধরে এগিয়ে গেলে অনেকখানি অবকাঠামোর পরিবর্তন সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞদের মত কারণ বেল্ট রোডের প্রধান উদ্দেশ্যের সাথেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
  • রপ্তানি খাতের পণ্যের বিচিত্রতা আনা খুব বেশি জরুরি। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য বলতে মূলত পাট, চা, চামড়া, চিংড়ি, তৈরি পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর বাহিরে বিস্তৃতি করতে হলে প্রচুর অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি উন্নত মেশিনারিজ প্রয়োজন। বেল্ট রোড নির্মাণের উদ্দেশ্যের পেছনে চীন থাকলেও তার অংশীদারী দেশসমূহের এই সকল স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় গুলো বড় করে দেখছে বিশেষজ্ঞরা এবং তারা মনে করছেন এই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এই ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর অনেক বেশি উন্নয়ন সাধিত হবে। 
  • বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানিকৃত পণ্যগুলোর নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত পশ্চিমা দেশগুলোতে নিজ পণ্যের রপ্তানি করে থাকে। এই বেল্ট রোডের হাত ধরে নতুন বাজার যেমন মধ্য এশিয়া সহ ইউরোপের বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, তেমনি এশিয়ার মধ্যেও আরো বৃহদাকার রুপে রপ্তানীমুখী হবে। কেননা, এই বেল্ট রোড এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে আরও বেশি সংযোগ স্থাপন করবে। এই রোডগুলোর হাতে বাংলাদেশের নতুন বাণিজ্যিক বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা এড়ানো যায় না।
  • বিদেশি রেমিটেন্সের প্রভাব বাড়াতে হলে অবশ্যই উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। বেল্ট রোডের অধীনে এই সম্ভাবনা অনেক বেশী, ফলে বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিকরা কাজ হারালেও চায়না প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীবাহীনি গড়ার মাধ্যমে রেমিটেন্সের প্রভাব সামলানো যাবে। আবার এর অধীনে দেশগুলোতে অনেক বেশি চাকরির সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই বেল্ট রোড এর ফলে বাংলাদেশের অনেক অদক্ষ শ্রমিক চীনা প্রশিক্ষণের হাত ধরে নিজের দক্ষতা উন্নয়ন করতে পারবে। 
  • নতুনভাবে যে কমিউনিটি গড়ে উঠবে তার ফলে চীন ও অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে চীন বহুদূর এগিয়ে আছে। ফলে বাংলাদেশের ভিশন অর্জন ও উন্নত রাষ্ট্রে পৌছানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রে সহযোগী হয়ে দাঁড়াবে ফলে বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত করতে পারবে। 

অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য উৎপাদন সূচির ব্যাপক অগ্রগতি হবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। 

আবার অন্যদিকে, চীনা রাষ্ট্রদূত জানান বিসিআইএম (বাংলাদেশ – চায়না – ইন্ডিয়া – মালয়েশিয়া) অর্থনৈতিক করিডোর এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান যার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে চলেছে বাংলাদেশ।

ভারতের উদ্বেগের কারণঃ 

এশিয়ার ত্রিপল বা প্রতিদ্বন্দ্বী দুটো দেশ ভারত ও চীন। আবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেল্ট রোড পরিকল্পনার প্রকাশ্য বিরোধিতা করতে পারছে না ভারত। কারণ এ প্রকল্পের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উন্নয়নের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে। ফলে ভারত সরাসরি সহমত বা বিরোধিতা করা থেকে এড়িয়ে যাচ্ছে। 

ভারত মূলত যে কারণগুলোর জন্য বেল্ট রোডের সাথে একমত হতে পারছেনা, সে কারণগুলো হচ্ছে—- 

  • নিরাপত্তা সংকটে পড়বে ভারত। কেননা বেল্ট রোড বাস্তবায়িত হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল চীনের সামনে খুলে দিতে হবে। ওই এলাকার দীর্ঘদিনের স্পর্শকাতরতার অবস্থা বিদ্যমান করছে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরে যেতে চায় না ভারত। আবার প্রস্তাবনা কার্যকর হলে ভারত উপমহাসাগরে চীন সামরিক শক্তির প্রভাব সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে বলে সম্ভাবনা দেশটির। 
  • বেল্ট রোডের ৬টি অর্থনৈতিক করিডোরের মধ্যে একটি পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একে চীনের ফাঁদ মনে করে ভারত কয়েক বছর আগেই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারত মনে করে এই প্রকল্প কোন আন্তর্জাতিক বা গ্লোবাল প্রকল্প নয় বরং চীনের আঞ্চলিক স্বার্থ  হিসেবে দেখে ভারত। 
  • এশিয়ায় ভারতের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বি দেশ চীন। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোকে এক এক করে চীন যে হারে প্রভাবিত করছে এবং ঋণ প্রদান করে ফাঁদে ফেলছে ভারতের বিশ্বাস অদূর ভবিষ্যতে যখন দেশগুলো ঋণ পরিশোধে অক্ষম হবে তখন দেশগুলোকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করবে চীন। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহকে প্রভাবিত করা নিয়ে দেশটি চিন্তিত। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তান ভারতের প্রতিকূল হলেও সম্প্রতি নেপালও ভারতে বিরুদ্ধাচারণ করছে। ভারতের ধারনা, চীন পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে নেপালকে লেলিয়ে দিচ্ছে তার বিপক্ষে।

তবে এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড নিয়ে সমালোচনাও কম নয়।

 সমালোচনাঃ–

  • অধিকাংশ সমালোচকরা মনে করেন, চীন রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা এশিয়াসহ অন্যান্য উপমহাদেশে এই প্রস্তাবনার সাপেক্ষে অংশীদারত্বের নামে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রদান করে ঐ সমস্ত দেশগুলোকে প্রভাবিত করা শুরু করবে। তাছাড়া, এরমধ্যে যারা ঐ ঋণ পরিশোধে অক্ষম হবে তখন ঐ সমস্ত দেশের সমুদ্র বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদে হস্তক্ষেপ করবে এবং সেইসাথে মিলিটারি ক্যাম্প বসানোর মতো ভয়ংকর কর্মকান্ডও ঘটতে পারে। পূর্বেও আমরা দেখেছি চীনের অর্থায়নে শ্রীলংকার দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত হাম্বানটোটা বন্দর নির্মিত হওয়ার পর অধিকাংশ সময় তা অব্যবহৃত থাকায় পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কা বাধ্য হয়ে যার ৭০ ভাগ চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। একইভাবে চীনের নৌবাহিনীর জাহাজ ঘাটিও করতে পারে ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরে। 
  •  আন্তর্জাতিক বানিজ্যিক কর্মকান্ডে ব্যাঘাতঃ চীনের বৃহদাকার উৎপাদনের ফলে চীনা পণ্যের একক প্রতি মূল্য এবং মানের সাথে অন্যান্য দেশের টেক্কা দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে। তারা একেবারে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করে একক প্রতিদান এতটা কমিয়ে আনে যার ফলে যেকোনো বাজারে সহজেই ধ্বংসলীলা চালাতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে অন্তর্ভুক্ত দেশ সমূহে চীনা পণ্যের বাজার সৃষ্টি হবে যার ফলে ওই দেশের ওই সকল দেশের অভ্যন্তরীণ কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খাবে। একপর্যায়ে সম্পূর্ণ বাজার বা অর্থনীতি চীনা নির্ভরতা ধারণ করবে।
  • নিরাপত্তা ইস্যুঃ বেল্ট রোডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে—  নিরাপত্তা ইস্যু। মিয়ানমারে চীনা পাইপলাইন ও ড্যাম, পশ্চিম আফ্রিকার বন্দরগুলো, আফগানিস্তানের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তামার খনিগুলো চীন কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে চীনা সামরিক উপস্থিতি প্রসারিত হতে পারে। 
  • ডেথ ফাইন্যান্সিংঃ অনেকে মনে করে এই প্রকল্পের অর্থায়ন সলিড কোন খাত থেকে হচ্ছে না, বরং তা হবে ডেথ ফাইন্যান্সিং এর মাধ্যমে। 

যা ঐ অংশীদারি দেশগুলোকে ঋণের মধ্যে ফেলে দিবে এবং যখন এই ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়বে দেশগুলো, তখন চীনের ব্যবহার সম্ভবত মুদ্রার অপর পিঠ এর মত ধারণ করবে। হয়তো চীন ঐসকল অংশীদারী দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়াবে এবং তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে দখলদারিত্ব চালাবে।

নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকা সত্বেও এটা নিশ্চিত যে এই বৃহৎ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন, পৃথিবীতে রাজত্ব করার পক্ষে আরেকধাপ এগুনোর পাশাপাশি অংশীদারী রাষ্ট্রসমূহের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যপক পরিবর্তন সাধিত করবে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো যদি প্রকল্পের সাথে তালমিলিয়ে চলতে পারে, তাহলে ব্যপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনন্য এক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

লিখেছেনঃ আল জোবায়ের আলিম