হুমায়ুন ফরীদিঃ “অভিনেতাদের অভিনেতা ” বলা হয় যাকে

জন্মদিনে অল্প কথায় কিংবদন্তি অভিনেতা প্র‍য়াত হুমায়ুন ফরীদি।।

44

জাকিয়া সুলতানা প্রীতি   

নবম শ্রেনীতে পড়ার সময় যাত্রার দল গড়েছিলেন। দুটি নাটকে অভিনয়ও করেন। বাবার চাকরিসূত্রে ঘুরেছেন নানা জেলা। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ৫ বছর পড়াশোনায় বিরতি। ভর্তি হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ঢাকা থিয়েটার, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়— অল্প কথায় এই হলো হুমায়ুন ফরীদির জীবনী।  

কিন্তু এতোটা পথ পাড়ি দেওয়া ও সফল হওয়া সহজ ছিলো না তাঁর। লোভে পাপ পাপে মৃত্যু চিরায়ত এই কথাটিকে সংক্ষেপ করে ফরীদি বলতেন, লোভে মৃত্যু। এ কারণেই লোভ করতেন না তিনি। নাটক-ছবিতে ভালো চরিত্রের জন্য যেমন আকাঙ্ক্ষা করতেন, তেমনি পছন্দ না হলে সরাসরি না করে দিতেন। ভাবতেন না কাকে না করছেন, এই ‘না’ করার ফল ভালো নাও হতে পারে…

‘না’ করতে পারার দুঃসাহস ও ক্ষমতা ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলো ফরীদির। যে কারণে জীবনের প্রথম টিভি নাটকের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এবং তার এই ‘না’ শুনতে হয়েছিলো তৎকালীন বিশিষ্ট টিভি ব্যক্তিত্ব আতিকুল হক চৌধুরীকে! এটাকে অনেকে বিরল ঘটনা মনে করেন।

১৯৮০ সালে নিখোঁজ সংবাদ — এর মাধ্যমে টেলিভিশন নাটকে অভিষেক হয় ফরীদির। নাটকটির প্রযোজক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।বিটিভির তৎকালীন কর্মকর্তা আতিকুল হক চৌধুরীর ডাকে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন ফরীদি। ‘নিখোঁজ সংবাদ’-এর চিত্রনাট্য পড়ে চরিত্র পছন্দ হয়নি তার। সরাসরি জানিয়েছিলেন যে, এতে কাজ করতে চান না তিনি। আতিকুল হক চৌধুরী অবাক হলেও বিষয়টি সহজভাবে নিয়েছিলেন। পরে আলাপ আলোচনায় আতিকুল হক চৌধুরীকে ফরীদি জানালেন যে, নাটকটির অন্য একটি চরিত্রে কাজ করতে চান তিনি। কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেন যে, অন্য চরিত্রটি তার জন্য যুক্তিযুক্ত, সেটিই তার কাছে আকর্ষণীয়। মজার তথ্য হচ্ছে, চরিত্রটি ছিলো একটি দৃশ্যের। এই হলেন ফরীদি…

এই ঘটনা ফরীদি বলেছেন একটি সাক্ষাৎকারে। যুক্তি দিয়ে জানিয়েছিলেন, যে চরিত্র পছন্দ হবে না, হাজার শ্রম দিয়ে অভিনয় করলেও সেটি ভালো করা সম্ভব নয়। ক্যারিয়ারে ফরীদি এমন কাজ তেমন করেননি। 

নাট্যাঙ্গনে নাকি একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, যদি টাকা লাগে তবে হুমায়ূন ফরিদীর কাছ থেকে ধার নাও। কারণ ফেরত দিতে হবে না। কাউকে টাকা দিলে তা নাকি বেমালুম ভুলে যেতেন। তাই কোনদিন ফেরতও চাইতেন না।

একবার সেটে নাকি চঞ্চল চৌধুরীকে দুপুরের খাবারে ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দেখেছিলেন। চঞ্চলের ভর্তা পছন্দের কথা শুনে একদিন বাসায় নানা রকমের ভর্তা বানিয়ে তাঁকে আসতে বলেন। চঞ্চল তখন পাবনাতে। রাত দুইটায় তিনি ঢাকা ফিরলে ঐ রাতেই নাকি ফরিদীর বাসায় যেতে হয় দাওয়াত রক্ষা করতে। গিয়ে দেখেন প্রায় ৫০ রকমের ভর্তা সামনে করে বসে আছেন ফরিদী। আরেকবার নাকি হুতাপাড়া থেকে সূবর্ণার জরুরী ফোন পেয়ে রাত ২ টার পর ঢাকায় রওনা হন। হঠাৎ মনে পড়ে প্রোডাকশন বয় ইসমাইলকে কোন টিপস দেয়া হয় নাই। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে বহুদূর এসে নিজে গাড়ি চালিয়ে আবার সেটে ফিরে গিয়ে ঐ রাতেই তাকে কিছু দিয়ে ঢাকায় ফেরেন। এমন বহু গল্প আছে যা তার হৃদয়ের বিশালতা প্রমাণ করে।

শুধু অভিনয় দিয়ে মানুষকে বিমোহিত করেছিলেন ডাকসাইটে এই অভিনেতা।

ফরীদিকে বলা হয় “অভিনেতাদের অভিনেতা, আদর্শ শিল্পী”।

অনেকের কাছে ব্যক্তি ফরীদির গল্পও বেশ অনুপ্রেরণা দেয়। তারা কী জানেন, ফরীদির মতো শিল্পী হতে সাধনা লাগে, দৃঢ় একটি মেরুদণ্ড লাগে…!

শুভ জন্মদিন,হে গুণী! এই গুণী মানুষের জন্মবার্ষিকীতে চ্যানেল আগামীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here