হিন্দুরাই যখন মহিষাসুরের পুজো করেন: আবার দুর্গা দর্শনও বারণ!

94

‘দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী, মহিষাসুর মর্দিনী জয় মা দুর্গা।’

 শরতের কাশফুলে যখন ছেয়ে যায় প্রকৃতি, তুলো মেঘে যখন সাজে নীল আকাশ, ঠিক তখনি বেজে উঠে মায়ের আগমনী ডাক। প্রকৃতি যেনো নিমিষেই উপলব্ধি করতে পারে। ধুপ ধুনো, দীপ, শঙ্খ আর ঢাকের তালে মেতে উঠে যেনো মানুষের  মন। বছরের  পর বছর এভাবেই যেনো পালন করে আসছে হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গা পূজা।

হিন্দুরা যে দুর্গো পূজো করেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু এ হিন্দুরাই নাকি আবার অসুর পূজো করেন এমনটা ভাবতেই যেনো অদ্ভুত লাগে।  যেই অসুরের অন্যায় নির্যাতনের হাত থেকে মর্ত্যবাসীকে রক্ষা করতে দেবী দূর্গা তার ত্রিশূল দ্বারা বধ করেছিলেন মহিষাসুরকে, সেই মহিষাসুরই নাকি পূজিত হন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের কাছে। অদ্ভুত হলেও এটাই সত্যি ভারতের এক প্রকার অসুর সম্প্রদায় দেবী দুর্গার বদলে মহিষাসুরের পূজা করেন।

বিজয়ীরাই সবসময় ইতিহাস রচনা করেন, আর পরাজিতরা পান উপহাস, বঞ্চনা। হিন্দুশাস্ত্র মতে, দেবতারা যখন অসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ তখন ত্রিদেব ও দেবতাদের তেজ থেকে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। অধিক শক্তির অধিকারিনী এই দেবী দুর্গাই তার পদতলে ত্রিশূল দিয়ে বধ করেন মহিষাসুরকে। তাই মাতৃরূপে পূজিতা হন দেবী দূর্গা আর অসুর রূপে পদদলিত হন মহিষাসুর। 

মহিষাসুরের পুজো

কিন্তু, অসুর সম্প্রদায়রা ভাবেন এর উল্টো। ভারতবর্ষের কিছু বিশেষ অঞ্চলের আদিবাসীরা তাদের মহিষাসুরের বংশধর বলেই ভাবেন। আর দেবী দুর্গাকে মনে করেন যমদূতের প্রতিনিধি। ভারতের প্রায় ৫০০টি জায়গায় এই অসুর সম্প্রদায়রা অসুরের জন্য পালন করেন শোকদিবস। আশ্বিনের শারদোৎসবের এই ৪ দিন অসুররা ঘর থেকে কোথাও বের হয় না। জানা যায়, ১৯৯১ সালের ভারতের আদমশুমারী অনুসারে অসুর বংশের সদস্যদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারের কিছু বেশি। তারা ভাবেন দুর্গাপূজার ৪দিন দেবী মর্তে আসেন অসুর নিধনের জন্য। এই ভয় থেকেই তারা দুর্গাপূজার সময় নিজেদের ঘরবন্দী করে রাখে। ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মাথাভাঙা মহকুমার কেদারহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের ইন্দ্রেরকুঠি গ্রামে অসুরদের বাস।

অনেকের ধারণা, তাদের আদিবাস ঝাড়খন্ডে, আবার কারও মতে, আসামের গৌহাটি। ভারতের কবি ও লোকসংস্কৃতির গবেষক রণজিৎ দেব ইতিহাস ঘেঁটে জানতে পেরেছেন, অসুর সম্প্রদায়ের আবাস প্রাগজ্যোতিষপুরের আসাম রাজ্যের একটি অংশ এবং উত্তরবঙ্গের একটি অংশে। ভারতের ৪০টি সিডিউল ট্রাইব গোষ্ঠীর মধ্যে এরা হচ্ছে অসুর গোষ্ঠী।

বিভিন্ন স্থানের অসুর সম্প্রদায়ের বর্ণনাঃ

আলিপুরদুয়ারের অসুর জাতি, এখানকার অসুর জাতি প্রায় লুপ্ত হওয়ার পথে হলেও, তারা তাদের ব্যতিক্রমী সংস্কৃতি নিয়ে বেশ গর্বিত। এই অসুর সম্প্রদায় বিহারে ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল গুলমা ও লোহারডাঙ্গা জেলায় বসবাস করেন। প্রাচীনকালে তাদের পূর্বসূরিরা লোহা গলানোর কাজ করতো। ইতিহাসবিদরা ঢালাই করে এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারবেনা যে মহিষাসুরের সঙ্গে এদের কোন যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এটা মনে করা হয় যে তারা মূলত অষ্ট্রিক জনগোষ্ঠী। এরা অষ্ট্রো এশিয়াটিক ভামাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলেও বর্তমানে তারা আঞ্চলিক ভাষাতেই কথা বলে, তাছাড়া বর্তমান প্রজন্মরা হিন্দি ও সাদরি ভাষাতেও কথা বলতে পারে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে এখানকার অসুর সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ৪,৮৬৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারে। জলপাইগুড়িতে মোট ৩,১০৮ জন বাস করেন। এখানকার নাগরাকাটা ব্লকের কেরন চা বাগান এলাকায় সংখ্যাটা বেশি। সেখানে প্রায় ৫শ পরিবারের  বসবাস বিশেষ করে তারা চা বাগানে কাজ করে।

অসুর সম্প্রদায়

মাঝের ডাবরি চা-বাগানের অসুর জাতি, এখানে প্রায় ৭০টি পরিবারের বসবাস। ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, অসুরদের মধ্যে ৫২.৭২ শতাংশ চা বাগানের শ্রমিক, ১৫.৬৫ শতাংশ কৃষক এবং ১৩.৬ শতাংশ ক্ষেত মজুর। প্রথমদিকে এরা চা বাগানে কাজ করলেও এখন অনেকেই কৃষিকাজ ও ক্ষেত মজুরের কাজ করেন। ধর্মের দিক থেকে প্রথমে সবাই হিন্দু হলেও, এখন অনেকেই বিভিন্ন ধর্মে ভাগ হয়েছেন। বর্তমানে ৪৮.৬ শতাংশ অসুর হিন্দু, ৪.৭৮ শতাংশ বৌদ্ধ, ১ শতাংশ মুসলিম ও ১৫.০৫ শতাংশ খ্রিষ্টধর্মালম্বী।

অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতো এদেরও একাধিক গোত্র আছে। এইসব গোত্রের নাম রাখা হয়েছে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবজন্তুদের নামে। যেমন- কাছুয়া অর্থাৎ কচ্ছপ, কেরকাটা অর্থাৎ পাখি বিশেষ, নাগ অর্থাৎ সাপ, শিয়ার অর্থাৎ শেয়াল, টিরকি অর্থাৎ পাখি বিশেষ, বারোয়া অর্থাৎ বন বেড়াল, আইল্ড অর্থাৎ পাকাল মাছ, বাসরিয়ার অর্থাৎ বেল এসব গোত্র। এদের গোত্রের মূল উদ্দেশ্য বিয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এদের স্ব গোত্রে বিয়ে হয়না। এদের পুরোহিত পাহান নামে পরিচিত। একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পাহান নির্বাচন করা হয়। এক্ষেত্রে নিজ সম্প্রদায় কিংবা কোরওয়ার, বিরাজিয়া সম্প্রদায় থেকেও নির্বাচন হয়ে থাকে।

অসুরদের প্রধান দেবতা হচ্ছেন সিংবোঙা ও মারাং বোঙা। এরা সিংবোঙাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য সাদা মোরগ উৎসর্গ করেন আর মারাং বোঙাকে সন্তুষ্ট করতে লাল মোরগ দেওয়া হয়। ধর্মীয় আচারে নিজেদের শুদ্ধিকরণের পাশাপাশি এরা অপদেবতার হাত থেকে রক্ষা পেতেও সদা ব্যস্ত। মহিষাসুর হচ্ছেন এদের পূজ্য দেবতা। তাছাড়া আরেক গ্রাম্যদেবতার নাম মহাদানিয়া। ইতিহাসবিদরা বলেন, অসুর সমাজে  অনার্যদের পাশাপাশি আর্য ভাবও অনেকটা প্রাধান্য পাচ্ছে। এরা মহিষাসুরের পূজো করেন বলে আজো উপেক্ষিত হয়।

অসুর সম্প্রদায়

পারস্পরিক সম্পর্কে ও পরিবারের ভাবনায় এরা খুবই বিশ্বাসী। এদের সমাজে বদল বিবাহ এবং ঘরজামাই প্রথারও প্রচলন আছে। বিয়ে মূলত কথাবার্তা বা আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই হয়ে থাকে। বাল্য বিবাহের প্রচলন নেই। প্রথম স্ত্রী থাকলে দ্বিতীয় বিবাহ সম্ভব নয়। তাছাড়া বড়ো ভাইয়ের মৃত্যু হলে ছোট ভাই বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন কিন্তু ছোট ভাই মারা গেলে বড় ভাই ছোট ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারে না। কিন্তু বংশরক্ষার্থে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবেন। এই বিবাহের সকল কর্ম ও দায়িত্ব পালন করেন পাহানরা, ঘটকরা আগুয়া নামে পরিচিত। অন্দুরদের বিবাহ রীতিতে সিঁদুর দানের একটু ভিন্নতা আছে। পাত্র যেমন নববধূকে কনিষ্ঠা আঙ্গুল দ্বারা কপালে সিঁদুর পড়ায়, পাত্রীও তার ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে পাত্রের কপালে সিঁদুর পড়ায়। হিন্দুদের সঙ্গে অনেকাংশেই মিল আছে এদের রীতিনীতিতে।

ওপার বাংলার পুরুলিয়া, পূর্ব বর্ধমানের অসুর পূজো, পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামে দশমীতে দেবী দুর্গার বিসর্জনের পরই ধামসা, মাদল, সারিন্দা, করতাল, আড় বাঁশি বাজিয়ে পালন করা হয় দাঁশাই পরব। এই পরবে মহিষাসুরের স্মরণ উৎসবের আয়োজন করে মেতে উঠে শখাগাঙা এলাকার সাঁওতাল নারী পুরুষরা। এরা সবাই অসুর জাতি, দেবী দুর্গার বদলে এখানে অসুর পূজা করা হয়। এছাড়া পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও এই চিত্র দেখা যায়। এখানকার খেড়ওয়াল জনজাতিরা নিজেদের অসুর বলে মনে করেন। তারা দুর্গাকে পুরুষ বলে মনে করেন অর্থাৎ তাদের আদর্শ মহিষাসুরকে হুদুড় দুর্গা বলে মনে করেন। তাদের ধারণা এককালে বহিরাগত আর্য এই অনার্যদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে একজন নারীর সাহায্য নেন। কারণ মহিষাসুর কখনই নারীও শিশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। আর এর সুযোগ নিয়েই অনার্যদের সর্বশ্রেষ্ঠ বীরযোদ্ধা মহিষাসুরকে বধ করেন। এর ফলে ভূমিপুত্র খেড়ওয়াল আদিবাসীরা তাদের ক্ষমতা হারায়, যেটা তাদেরকে শোকপ্রবণ করে তোলে।তাই আজও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত খেড়ওয়ালের সাঁওতাল, মুন্ডা আদিবাসীর পুরুষরা সেরেঞ বা ভুয়াং হাতে নিয়ে দাঁশাই নাচ করার মাধ্যমে নিজেদের আত্মরক্ষা ও মহিষাসুরের শোকগাথার মাধ্যমে প্রমাণ করেন তারা কতটা বঞ্চিত ও অবহেলিত। কালীপূজোর দিন তারা আদিবাসীদের দ্বারা পালিত বাঁদনা পরবে গৃহপালিত পশু হিসেবে মহিষের পূজো করেন।

ঝাড়খন্ডে অসুরের পূজো—-

মহিষাসুর ছাড়াও ঝাড়খন্ডের বিষনপুরের অসুররা রাবন বধও মেনে নিতে পারেনি। ঝাড়খন্ডের তিনটি গ্রাম ঘাগরা, চৈনপুর, বিষনপুরে দুর্গাপজো এলেই যেনো শোকের ছায়া নেমে আসে, তারা ঘরে ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকে পূজোর এই ৪দিন। তারা সাদা থান পড়ে শোক পালন করে। তারা অসুরের পাশাপাশি রাবন পুজাও করেন। এরা ঝাড়খন্ডের আদিবাসী নয় এরা মূলত মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিসগড় থেকে এসেছে।

এবার একেবারে বাস্তবের জায়গা থেকে বলি। অসুররা এমনিভাবেই প্রতারিত। হুদুর নামের এক অসুর সাঁওতাল গোষ্ঠীর পরাক্রমশালী  রাজা ছিলেন। তাকে হারাতে না পেরে তার রাজ্যলোভী শত্রুরা দুর্গাকে পাঠায়। নারীর সাথে যুদ্ধ করার জন্য ঘোর আপত্তি হুদুরের। কিন্তু শত্রুরা হুদুরকে মারার জন্য উদ্যত হয়ে আছেন, এবং দুর্গাকে নামায় অন্য খেলায়। হুদুরের সাথে দুর্গার বিয়ে হয়। কিন্তু সবটাই ছিলো দুর্গার ছলনা আর দশমীতে দুর্গা ছলনার দ্বারা বধ করে হুদুরকে। রাজ্যহীন সাঁওতালরা তখন নারীর সাজে রাজ্য থেকে পালিয়ে যান। এই দশমীর দিনেই নারী বেশে যুদ্ধাস্ত্রগুলোকে বাদ্যযন্ত্রের রূপ দিয়ে নাচতে নাচতে খোঁজেন হুদুর দুর্গাকে অর্থাৎ তাদের রাজাকে। তারা ভাবেন এই হুদুর দুর্গার জন্যই নাকি তারা তাদের প্রিয় রাজাকে হারান। তাই উৎসব হচ্ছে শোক পালনের উৎসব আর দাশাই মানে দুঃখের মাস। আমরা দুর্গা পূজোর সময় সাজপোশাক আর প্যান্ডাল তৈরিতে  এতোই মেতে থাকি যে এসব ধুলো মাটির মানুষদের একদম লক্ষ্যই করি না। এর ফলেই হারিয়ে যাচ্ছে খোদ অসুর বংশ।

এই উদ্ভাবনীর ইতিহাসে আজও পড়লো না স্বীকৃতির শীলমোহর। পরাজিতরাই বরাবর হতভাগ্য, বিজিতরাই ইতিহাস রচনা করেন। আর জয়ের দিন, ক্ষন, তারিখ সব তাড়িয়ে উপভোগ করে এবং আগামীকে আহ্বান জানায় কিন্তু দুর্গা পূজায় সারা দিতে পারে না অসুর সম্প্রদায়রা। দুর্গার পদতলে থাকা মহিষাসুরকে দেখে তাদের হতভাগ্য পূর্বপুরুষের কথা মনে পড়ে যায়। তাই তারা এই সময় নিজেদের ঘরবন্দী করে রাখে এবং ঘর ছেড়ে বাইরে কোথাও বের হয় না। মহিষাসুরের বুকে পেটে নাভিতে ত্রিশূলবিদ্ধ হওয়ায় অসুর সম্প্রদায়রাও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত জাত্যাভিমানের উপশম হিসেবে বুকে পেটে নাভিতে করঙ্গ ফুলের তেল লাগায় আর সাদা থান পড়ে থাকে। একেই ‘মহিষাসুর দশা’ বলে। আর দীপাবলিকে বলে ‘ সোহরাই, শোকের উৎসব’।

অসুর সম্প্রদায়ের সেই সকল চিরায়ত অন্যায় কাহিনী কাউকে শোনানো হয়নি সঠিকভাবে। তবে অসুরদের উৎসব কে কেন্দ্র করেই অসুর জাতির লুকায়িত উপকথার হাত ধরে একটু একটু আলোর দিকে মুখ ফেরাচ্ছে আর জানতে পারছে এই ভূমিপুত্রদের চাওয়া পাওয়ার কথা।

লিখেছেন: যুবশ্রী ঘোষ