স্বর্ণকুমারী দেবী: প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিক

26

আমরা যারা নারী জাগরণ নিয়ে কথা বলি, কিংবা নারী মুক্তির কথা বলি তারা কখনই এটা ভাবি না এই  দৃষ্টান্তমূলক কাজের পেছনে কারা রয়েছেন? তেমনি নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির এক অনন্য ব্যক্তি হচ্ছেন  স্বর্ণকুমারী দেবী। যিনি সমস্ত অবগুন্ঠন ছেড়ে মৃদুপথে বেরিয়ে ছিল নারী মুক্তির জন্য। তিনি মনে করতেন নারীরাও প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে আর তা তিনি  প্রমাণ করেছিল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে। আমরা এতই ‘সৌভাগ্যবান’ ছিলাম যে নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে এই সংগ্রামী অনন্য মহীয়সী নারীকে পেয়েছিলাম।

 আজকে আমরা এই বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচিত হবো তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক লেখিকা। বাঙালি নারীদের দীপশিখা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতজ্ঞ ও সমাজ সংস্কারক। তিনিই হচ্ছেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য মহিলা সাহিত্যিক। তিনি মূলত ঐতিহাসিক ও সামাজিক এই দুই ধরনের উপন্যাস লিখেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। ১৮৫৫ সালের ২৮ আগস্ট (বৃহস্পতিবার, ১৪ভাদ্র, ১২৬৩ বঙ্গাব্দ) জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্রী আর  দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা। মা সারদা সুন্দরী দেবী। ১৫ জন ভাইবোনের মধ্যে স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন দশম। ভাই ৯জন এবং বোন ৬জন। ভাইদের নাম হচ্ছে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর,  বীরেন্দ্র নাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, পুন্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুধেন্দ্রনাথ  ঠাকুর।

বোনদের নাম হচ্ছে সৌদামিনী দেবী, সুকুমারী দেবী, শরৎকুমারী দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী ও ছোটবোন বর্ণ কুমারী দেবী।

শিক্ষাজীবন: 

বড় দিদি সৌদামিনি ছিলেন বেথুন স্কুলের প্রথম যুগের ছাত্রী। বাড়ির অন্যান্য মহিলা সদস্যরা বড় দিদি সৌদামিনী কে অনুসরণ করলেও স্বর্ণকুমারী দেবী প্রধানত বাড়িতে লেখাপড়া শিখেছিলেন। স্বর্ণকুমারী দেবী ছোট ভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে ৫ বছরের বড়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৪ জন সন্তানের মধ্যে একমাত্র তিনিই ঠাকুর পরিবারে প্রথম মহিলাদের লেখনীর ধারা শুরু করেন। ১৯ শতকের বাংলা নবজাগরণের পুরোধা ছিল এই ঠাকুর পরিবার। ছেলেমেয়েদের নবযুগের চেতনায় আর শিক্ষায় মানুষ করে তোলার উপলব্ধি হয়েছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাই তিনি নিজের পরিবারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উভয় শিক্ষার সমন্বিত রূপটি প্রবেশ করিয়েছিলেন। একটি সুস্থ-সুন্দর পরিবেশ ও  চেতনা গড়তে চেয়েছিলেন পরিবারের মহিলাদের মধ্যে। শুরু থেকেই ঠাকুরবাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ ছিল। দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথ শিক্ষার প্রসার নিয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্মৃতি কথায় লিখেছেন, বিদ্যালয়ের থেকে বাড়ীতে বেশীরভাগ শিক্ষায় লাভ করেছিলেন। স্বর্ণকুমারী দেবী স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, তাদের শিক্ষয়িত্রী শ্লেটে কিছু লিখে দিতেন আর তা তারা টুকে লিখতেন। দেবেন্দ্রনাথ এই কথাটি জানতে পেরেই এই যান্ত্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতি তুলে দেন। এবং অযোধ্যানাথ পাকড়াশী নামে এক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করেন মেয়েদের জন্য। বাড়ির মেয়েরা অযোধ্যানাথ পাকড়াশীর কাছে বাংলা ও সংস্কৃত শিখতেন, আর ম্যামের কাছ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ নিতেন। তাছাড়া দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই অনেক সময় বাড়ির মেয়ে বউদের গল্পের মতো করে জ্যোতির্বিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পাঠদান করতেন। এর গভীর প্রভাব পড়ে কন্যা স্বর্ণকুমারী এর উপর, যার দরুন তার বিজ্ঞান বিষয়ক রচনার ভিত গড়ে ওঠে। ছোটবেলায় বড় দিদিরা স্কুলে গেলেও স্বর্ণকুমারী শিক্ষাজীবন শুরু ও শেষ হয়েছিল বাড়িতেই। সিলেবাসের বোঝা না থাকায় নিজের চেষ্টায় নানাবিষয়ে প্রচুর বই পড়ে  স্বশিক্ষিত হয়ে ওঠেন। সাহিত্য, বিজ্ঞান, সমাজ প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল অসামান্য। ঠাকুর পরিবারের অন্তঃপুরে সব মেয়েদের মধ্যে এক হীরকখণ্ডের মত  নিজের প্রতিভার দীপ্তিতে ক্রমশ ভাস্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কাব্য, সঙ্গীত, পাঠক, ছোট গল্প, রম্য-রচনা, গীতিনাট্য ও প্রবন্ধ লেখা, সাংবাদিকতা, পত্রিকা সম্পাদনা, সমাজ সংস্কারক মূলক কার্যক্রম, সমিতি স্থাপন, সর্বোপরি উপন্যাস লেখা সমস্ত ক্ষেত্রে নিজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। উনিশ শতকে সমকালীন স্বদেশী ও বিদেশী প্রায় সব বিদ্বান মানুষরাই তাকে বাংলার নবজাগরণের এক বিদূষী মশাল বাহক হিসেবে স্বীকার করেন। 

বৈবাহিক জীবন:

পরিবারের প্রথা অনুযায়ী মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে (১৭নভেম্বর, ২অগ্রহায়ন, ১২৭৪ খ্রিস্টাব্দে) জানকীনাথ ঘোষালের সাথে স্বর্ণকুমারী দেবীর বিবাহ হয়। স্বামী ছিলেন শিক্ষিত, সমাজ সচেতন, যুবক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি ছিলেন নদীয়া জেলার এক জমিদার পরিবারের শিক্ষিত সন্তান। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার ছিল পিরালী ব্রাহ্মণ। পিরালী ব্রাহ্মণ ( অপরাধমূলক নিন্দাসূচক অর্থদ্যোতক) বংশের  কন্যাকে বিবাহ করার জন্য জানকীনাথ পরিবারচ্যূত হয়েছিল। কিন্তু দৃঢচেতা জানকীনাথ নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করে সাফল্য অর্জন করেন এবং নিজস্ব জমিদারি তৈরি করে রাজা উপাধি অর্জন করেন। তিনি একজন দিব্যজ্ঞানবাদী (থিওসফিস্ট) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা আদিযুগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ঠাকুরবাড়িতে বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীসহ বাপের বাড়িতেই থাকবার প্রথা হলেও  স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ তা পালন করেননি। বিবাহের পর স্বর্ণময়ী কে লেখাপড়ায় বিশেষভাবে তার স্বামী সাহায্য করায় তিনি নানা ধরনের বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

 জানকীনাথ ও স্বর্ণকুমারী দেবীর চার সন্তান ছিলেন। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে ৫ ডিসেম্বর ১২৭৫ বঙ্গাব্দ ২১ অগ্রহায়ন তার প্রথম কন্যা হিরন্ময়ী দেবী জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম সন্তান জন্ম গ্রহণের পর তার শ্বশুর তাকে এবং তার কন্যাকে আশীর্বাদ করেন এবং এর দ্বারা জানকীনাথ এর সাথে তার পিতার সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তার দ্বিতীয় সন্তান জ্যোৎস্নানাথ  ঘোষাল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পশ্চিম ভারতে কর্মে বহাল ছিল। এরপর ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর ২৫ ভাদ্র ১২৭৯ বঙ্গাব্দ তৃতীয় সন্তান সরলা দেবীর জন্ম হয়। এবং সর্বশেষ সন্তান কন্যা উর্মিলা দেবী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে। 

 লেখক জীবন:

বিয়ের আগ থেকেই তার লেখক জীবন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর তাতে কোনো আঁচ লাগেনি। বরং বিয়ের পর তার সাহিত্যপ্রতিভার পূর্ণ আলোক বিচ্ছুরণ ঘটে। প্রগতিবাদী স্বামী জানকীনাথ এর সহযোগিতায় স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যচর্চা আরো গভীরভাবে দৃঢ় হলো। সংগীত, নাটক ও সাহিত্যে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের দৃষ্টি শীলতা স্বর্ণকুমারী দেবী কেও স্পর্শ  করেছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগীত, নাটক, সাহিত্য নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, আর এতে সাহায্য করছিল অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি থেকে জানা যায়, জানকীনাথ যখন ইংল্যান্ডে যান তখন স্বর্ণকুমারী দেবী অনেকদিন তার বাপের বাড়িতেই থেকে যান। এই সময়েই তার সঙ্গীত চর্চার, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার, ও ভালোভাবে ইংরেজি সাহিত্য পাঠের সুযোগ হয়েছিল। তাছাড়া তিনিও দাদাদের সঙ্গে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে মেতে ওঠেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন পরিবারের প্রাচীন প্রথা গুলিকে নারী স্বাধীনতার পথ হিসেবে প্রশস্ত করছিলেন তখন স্বর্ণকুমারী নিজের সাহিত্য সাধনায় মগ্ন ছিলেন। বাড়ির অন্য মেয়েরা ঘরের কাজে, রান্নাঘরে নতুন নতুন খাবার তৈরিতে, নানান রকম হাতের কাজে, রূপচর্চায় আর গল্প-গাছায় যখন সময় কাটাতেন তখন তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখতেন এই সবথেকে। তার মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরানী এর লেখা থেকে জানা যায়, সরলা মাঝে মাঝে অন্দরমহলের মেয়েদের আসরে উপস্থিত থাকলেও তার মাকে কখনো সেখানে দেখেনি। স্বর্ণকুমারী দেবী তখন নিজের ঘরে আপন-মনে ব্যস্ত থাকতেন নিজের পড়াশোনা, সংগীত রচনা ও সাহিত্য সাধনায়।

প্রথম উপন্যাস রচনা:

গল্প কবিতা লেখা দিয়ে তার সাহিত্যে হাতে খড়ি হতে না হতেই তিনি অন্য একটি মস্ত বড় কঠিন কাজ সম্পাদন করলেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ লেখা হয়। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ছাপা হয়। এটি বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশের এক দশকের মধ্যে বাংলা ভাষাতে লেখা কোন মহিলার প্রথম উপন্যাস। এর মধ্যেই ১৮৫২ সালে হানা ক্যাথারিন মুলেন্স তার ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেন। কিন্তু স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিক। দীপনির্বাণ উপন্যাসটি ছিল জাতীয়তাবাদী ভাবে অনুপ্রাণিত এক উপন্যাস। দেশের মানুষের নৈতিক অবনতি আর আত্মকলহের সুযোগে বিদেশি শত্রু বারবার আমাদের দেশকে আক্রমণ করেছে, জয় করেছে, হরণ করেছে আমাদের স্বাধীনতা। সেই গ্লানি আমাদেরকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে শুধুমাত্র নিজেদের কারণেই। এই বক্তব্যই প্রকাশিত হয়েছে তার দীপনির্বাণ উপন্যাসে। এর বক্তব্যের গুরুত্বই যুগের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটিকে  গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। এই নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে তা হচ্ছে, প্রথমে উপন্যাস এর লেখক এর নাম এর পরিবর্তে লেখা ছিল জনৈক লেখিকা। এদেশে তখন স্ত্রী শিক্ষার প্রসার ঘটেনি। অনেক মহিলাই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। সে সময় কোন মহিলার উপন্যাস লেখাটা ছিল বেশ শক্ত কাজ। কলকাতার তখনকার বিদ্বান পন্ডিত মানুষেরা উপন্যাসের ভাষা আর বিষয়বস্তুর তাৎপর্য দেখে বিস্মৃত হয়েছিল। তার লেখা উপন্যাসের প্রশংসা পেয়েছিল কলকাতার নামকরা পত্রিকা হিন্দু প্যাট্রিয়ট, দ্যা ক্যালকাটা রিভিউতে। দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ইংল্যান্ডে থাকায় তার কাছে সেই উপন্যাসের এক কপি পৌঁছায়। তিনি একদম বিশ্বাস করতে পারেননি যে একজন মহিলা এই রকম একটি উপন্যাস লিখতে পারেন। তিনি ভেবেছিলেন উপন্যাসটি লিখেছিলেন তার ছোটভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছদ্মনাম ব্যবহার করে। তিনি অভিনন্দন জানিয়ে তাকে চিঠি লিখেছিলেন “জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে?

এরপর স্বর্ণকুমারী দেবী আরো অনেক উপন্যাস নাটক কবিতা ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান পরিভাষা রচনা বিষয়ে তার আগ্রহ ছিলো ব্যাপক। তিনি অসংখ্য গানও রচনা করেন। সেই সময়ে স্বর্ণকুমারী দেবী বা কামিনী রায়ের মতো মহিলা সাহিত্যিকদের গুরুত্ব অপরিসীম। তারাই ছিলেন বাঙালী নারী সমাজের প্রথম যুগের শিক্ষিত প্রতিনিধি। নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে তাদের দায়িত্ব গুলি সাহিত্য রচনার মাধ্যমে পালন করেছিলেন তারা। ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে ১৯ কার্তিক ৪ নভেম্বর স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাংলা গীতি নাট্য (অপেরা) বসন্ত উৎসব চালু করেন। ৩১ ডিসেম্বর ১৭ পৌষ তার কনিষ্ঠ কন্যা উর্মিলা দেবী মারা যান। পরবর্তীকালে এই ধারাটিকে গ্রহণ করে তার ছোটভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সার্থকতর গীতিনাট্য রচনায় সফল হয়েছিল। স্বর্ণকুমারী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া ঠাকুর পরিবারের আর কেউই এত বেশি লিখতে পারেনি। ১৩ টি উপন্যাস, ৪টি নাটক,  গীতিনাট্য বসন্ত উৎসব ছাড়াও প্রকাশিত হলো তার বিজ্ঞান বিষয়ক সাতাশটি  প্রবন্ধ সংকলন পৃথিবী। 

শৈশবে বিজ্ঞানের পাঠ যার কাছ থেকে শুরু হয়েছিল সে মহর্ষি পিতাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই তার নামে বিজ্ঞান প্রবন্ধের বইটি উৎসর্গ করেন। 

পত্রিকা সম্পাদনা:

লেখক থেকে সম্পাদকে পরিণত হতে বেশী সময় লাগেনি স্বর্ণকুমারী দেবীর। ১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক পত্রিকা ভারতী নামক মাসিক সাহিত্য পত্রিকা চালু করেন। এ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হচ্ছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ৭  বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ২০-২১ এপ্রিল ৯-১০ বৈশাখ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী  কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। এই কারণে ভারতী পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কাদম্বরীদেবীর মৃত্যুর আগে ভারতী’র বৈশাখ ১২৯১ সংখ্যার প্রায় অর্ধেকটা ছাপা হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে বাকি অংশ সহ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্পাদনায়। তবে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ যুগ্ম সংখ্যা হিসেবে। ১৩০২ বঙ্গাব্দে স্বর্ণকুমারী দেবী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে তিনি ভারতী সম্পাদকের পদত্যাগ করেন। ভারতীর বৈশাখ ১৩০২ সংখ্যা থেকে সম্পাদকের দায়িত্ব পান স্বর্ণকুমারীর দুই কন্যা হিরন্ময়ী দেবী ও সরলা দেবী। এরপর মাঝখানে ১৩০৫ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ এক বছর এটি সম্পাদনা করার পর সরলা দেবী আবার এর দায়িত্ব নেন। সরলা দেবীর বিবাহের পর ১৩১৪ বঙ্গাব্দে পত্রিকাটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৩১৪ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে সরলা দেবী পাঞ্জাব থেকে কলকাতায় এসে এর দায়িত্ব সৌরিন্দ্রমোহনের হাতে   অর্পণ করেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের জন্য ১৩১৪বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত হওয়ার পর এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৩১৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাস থেকে স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্পাদনায় পুনরায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

ভারতী যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর প্রথম থেকেই এই পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এই পত্রিকার চাহিদাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়মিত লিখতে বাধ্য করতো। ১৩২০ বঙ্গাব্দের ১৯ বৈশাখ ২মে  ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে স্বর্ণকুমারী দেবীর স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল মৃত্যুবরণ করেন। ১৩২১ বঙ্গাব্দে তিনি ভারতী পত্রিকা সম্পাদনা পদত্যাগ করেন। পত্রিকাটি পারিবারিকভাবে শুরু হলেও এতে লিখতেন অনেক অসামান্য সাহিত্যিক, চিন্তাশীল আর সমাজ সংস্কারক মানুষেরা। এটিতে সাহিত্য ছাড়াও তখনকার বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সমস্ত দিক নিয়ে লেখা প্রকাশিত হতো। এ পত্রিকাটিতে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন স্বর্ণকুমারী দেবী। 

রাজনৈতিক কার্যসম্পাদন:

মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে অবশ্যই পারে আর সেটা করা উচিত তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। নিজের জীবনেও তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন। লেখালেখির পাশাপাশি ১৮৮৯ ও ১৮৯০ সালে পন্ডিতা রামাবাই রানাড ও কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় এর সঙ্গে তিনিও জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নেন। স্বামী জানকীনাথ ঘোষাল  জাতীয় কংগ্রেসের সম্পাদক ছিলেন। তিনি নিজেও সামাজিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ভাবে  যুক্ত ছিলেন। তিনিই প্রথম বাঙালি মহিলা যিনি কংগ্রেসের জাতীয় অধিবেশনে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ের শহরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে ও ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে তিনি ছিলেন অন্যতম বাঙালি মহিলা প্রতিনিধি।

সখি সমিতি প্রতিষ্ঠা:

১৮৯৬ সালে ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী অনাথ ও বিধবাদের জন্য সখি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৮ সালে ভারতীয় ও বালক পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তা হচ্ছে সখি সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অসহায় অনাথ ও  বিধবাদের সহায়তা করা। এ কাজটি দুইভাবে করা হবে। যে ক্ষেত্রে এই সকল বিধবা ও অনাথদের কোন নিকট আত্মীয় থাকবেনা বা থাকলেও তাদের ভরণপোষণ ক্ষমতা আত্মীয়দের নেই তাদের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সখি সমিতি নেবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে সখি সমিতি তাদের যথাসাধ্য সাহায্য করবে। সখি সমিতি যেসব মেয়েদের পূর্ণ দায়িত্ব নেবে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে স্ত্রী শিক্ষার প্রসার ঘটাবে। তারা শিক্ষা সম্পন্ন করে অন্যান্য মহিলাদের লেখাপড়া শেখাবেন। সমিতি থেকে এই জন্য তাদের পারিশ্রমিকও দেওয়া হবে। এভাবে দুটি উদ্দেশ্য সাধিত হবে। হিন্দু বিধবারা হিন্দু ধর্মের অনুমোদনক্রমে শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জনক্ষম হয়ে উঠবেন।

সংগঠন পরিচালনা শুধুমাত্র সদস্যদের চাঁদায় সম্ভব নয় বলে স্বর্ণকুমারী দেবী বেথুন কলেজে একটি বার্ষিক মেলার আয়োজন করেন। এই মেলায় ঢাকা ও শান্তিপুরের শাড়ি, কৃষ্ণনগর ও বীরভূমের হস্তশিল্প এবং বহিবঙ্গের কাশ্মীর, মোরাদাবাদ, বারানসি, আগ্রা, জয়পুর, বোম্বাইয়ের হস্তশিল্প প্রদর্শিত হয়। তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা করা। এই মেলাটি তখন কলকাতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

১৯০৬ সাল পর্যন্ত এটি চালু ছিল। এরপর হিরন্ময়ী দেবী বিধবা আশ্রমের  দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বর্ণকুমারী দেবী কন্যা হিরণ্ময়ী দেবীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় বরানগরে একটি বিধবা আশ্রম চালু করেন। এই আশ্রমের নাম হচ্ছে মহিলা বিধবা আশ্রম। হিরণ্ময়ী দেবীর মৃত্যুর পরেই আশ্রম এর নতুন নামকরণ হয় হিরন্ময়ী বিধবা আশ্রম। এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা কালীন সময়ে কার্যনির্বাহী কমিটিতে ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী, ময়ূরভঞ্জের মহারানী সুচারু দেবী, কোচবিহারের মহারানি সুনীতি দেবী তারা দুজনই কেশবচন্দ্র সেনের কন্যা, লেডি হ্যামিলটন, প্রিয়ংবদা দেবী, শ্রীমতি চ্যাপম্যান ও শ্রীমতি  সিংহ। হিরন্ময়ী দেবী ছিলেন আশ্রমের সচিব। হিরণ্ময়ী দেবীর কন্যা অর্থাৎ আশ্রমের পরিচালিকা কল্যাণী মল্লিকের লেখা থেকে জানা যায় হাজার ১৯৪৯ সালেও এটি চালু ছিল।

সখি সমিতি নামকরণটি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সরলা রাইয়ের অনুরোধে সখি সমিতির জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ মায়ার খেলা নৃত্যনাট্যটি লিখে মঞ্চস্থ করেছিলেন।

স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনাসমূহ :

উপন্যাসসমূহ:

দীপনির্বাণ (১৮৭৬),

মিবার-রাজ (১৮৭৭)

টডের লেখা রাজপুতানার ইতিহাস পড়ার পর লিখলেন ‘মিবাররাজ’ (১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ)। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজপুতদের বীরত্ব আর জাতির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আত্মত্যাগের কাহিনী। কিন্তু পদানত,অবহেলিত,স্বভূমি থেকে উৎপাটিত আদি জনজাতি, ভূমিপুত্র ভীলদের বেদনা ও বিদ্রোহের কথাও লিখতে ভোলেননি। উচ্চবর্ণের রাজপুত আর আদিবাসী ভীলদের কাহিনী পাশাপাশি চলেছে তাঁর এই উপন্যাসে।

ছিন্নমুকুল (১৮৭৯), মালতী (১৮৭৯),

 হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৮৭)। হুগলীর ইমামবাড়ি’ও তাঁর লেখা ইতিহাসভিত্তিক  উপন্যাস। সে জায়গার পরিবেশ, ব্যবসাবাণিজ্য, সামাজিক পরিস্থিতি, জনজীবনের সুখদুঃখ, সবকিছুর কথাই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর এই উপন্যাসে। সেই সময়ে হুগলির কঠিন সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের কর্মে উজ্জ্বল দুই ভাই-বোন মহম্মদ মহসীন ও তাঁর বোনের দানশীলতার  কথা লিখতে ভোলেননি। বর্ণনা দিয়েছেন হাজী মহম্মদের প্রতিষ্ঠিত অনন্যপূর্ব স্থাপত্য ‘ইমামবাড়ী’র।

বিদ্রোহ (১৮৯০)

তাঁর শৈশবে ঘটে যাওয়া ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নিয়ে লিখছেন উপন্যাস ‘বিদ্রোহ’(১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ)।

স্নেহলতা (১৮৯২), কাহাকে (১৮৯৮), 

ফুলের মালা (১৮৯৫)

আর হিন্দু রাজা গণেশের উত্থানের কাহিনী নিয়ে লিখেছিলেন ‘ফুলের মালা’ উপন্যাস।

বিচিত্রা (১৯২০), স্বপ্নবাণী (১৯২১), মিলনরাতি (১৯২৫), সাব্বিরের দিন রাত (১৯১২)

নাটকসমূহ:

বিবাহ-উৎসব (১৮৯২),

বসন্ত-উৎসব (১৮৭৯)

ঠাকুর  পরিবারে ছেলেমেয়ে আর বউদের  মধ্যে সব সাংস্কৃতিক ব্যাপারে অংশ  নেওয়ার, বা নতুন কিছু করে দেখাবার একটা হুজুগ সবসময়েই কাজ করত। স্বর্ণকুমারীর লেখা  প্রথম গীতিনাট্য (অপেরা)‘বসন্ত-উৎসব’ (১৮৭৯) সে রকম একটা হুজুগেই লেখা  হয়েছিল।

রাজকন্যা, দিব্যকমল, দেবকৌতুক, কনেবদল, যুগান্ত, নিবেদিতা।

কাব্যগ্রন্থসমূহ:

গাথা, গীতিগুচ্ছ।

বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ:

পৃথিবী (১৮৮২)

শিশুপাঠ্য:

সচিত্র, বর্ণবোধ, আদর্শনীতি ইত্যাদি।

স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্মান ও স্বীকৃতি:

১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণকুমারী দেবী কে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।

স্বর্ণকুমারী দেবী বহু দেশাত্মবোধক গান লিখে স্বদেশ মন্ত্রে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন। বাংলার মহিলাদের মধ্যে তিনি প্রথম জগত্তারিণী স্বর্ণপদক সম্মানের অধিকারী হন। ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তার লেখা চালিয়ে গেছেন। চেতনা ও দৃষ্টির সর্বত্রগামীতা, নতুন যেকোনো ভালো পরামর্শ গ্রহণ করার মত উদার মানসিকতা, নারী কল্যাণ মূলক নানা অভিনব কার্যক্রম থেকে অনায়াসেই ঊনবিংশ শতাব্দীর চেতনার ক্ষেত্রে তাকে প্রথম নারীর স্থান দেওয়া যায়। 

   ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ৩রা জুলাই চির বিদায় নিয়ে চলে যান পৃথিবী ছেড়ে। তাঁর অপরিসীম কৃতিত্বের ফসল বাংলার নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। তার প্রতিভা ও কর্মের যোগ্য মূল্যায়ন করা আজও হয়নি। যদি হতো তাহলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত ও চলার পথের দিশা খুঁজে পেতো বাংলার নারীরা।

লিখেছেন: যুবশ্রী ঘোষ