সিঁড়ি থেকে নামতে নামতে বঙ্গবন্ধু বললেন, “আপনি কি চান?”

62

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, পশ্চিম পাকিস্তানের বিপক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন গল্পের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চোখে এক অদম্য উচ্চাভিলাস৷ শহরের গলিতে গলিতে বিজয় ধ্বনি, গ্রামের মেঠো পথে পাখির কলরবে বিজয়ের উচ্ছ্বাস। এমনটাই হয়তো সেদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর যখন নতুন এক পরিচয় পেলো বাংলাদেশ, তখন দেশের মানুষও স্বপ্ন দেখেছিলো সেই মহাপুরুষের হাতেই গড়ে উঠবে সোনার বাংলা। কিন্তু এর অন্তীম কেউ কি ভেবেছিলো? কেউ কি ভেবেছিলো সিঁড়ি থেকে নামতে নামতে বঙ্গবন্ধু বলে উঠবে তার শেষ কথা, “আপনি কি চান?” আর তখনই অঝোরে গুলি বর্ষিত হয়ে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে তার বুক?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

৭ জুন ১৯৭৫৷

গঠিত হয় বাকশাল। একদলীয় রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ঘোষনা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

১৯৭৩ সাল। ঝগড়া-বিবাদের জেরে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ল্যান্সার ইউনিট এবং ২ ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের কিছু কর্মকর্তা ও সৈন্যরা হামলা চালায় গোলাম মোস্তফার বাসায়। গোলাম মোস্তফা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। মেজর ডালিম, মেজর এসএইচএমবি নূর চৌধুরী এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়। মেজর ডালিম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন তবে তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এমন অবস্থায় অসন্তুষ্ট হোন মেজর ডালিম। দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে মেজর খন্দকার আবদুর রশিদ দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মেজর খন্দকার রশিদ, মেজর ডালিম এবং খন্দকার মোশতাক সিদ্ধান্ত নেন যে তাদের অবশ্যই বাকশাল বাতিল করতে হবে এবং শেখ মুজিবকে অপসারণ করতে হবে।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। বঙ্গবন্ধুকে অপসারনের পরিকল্পনায় তৈরী করা নকশা অনুযায়ী অগ্রসর হয় বিদ্রোহীরা৷ এক এক দলকে এক এক দায়িত্ব দেয়া হয়৷ রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় অভিজানের নেতৃত্ব দেন একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ। বিদ্রোহীরা জোর করে বাসভবনের প্রবেশের চেষ্টা করলে বাস ভবন রক্ষা করতে গিয়ে কিছু রক্ষী নিহত হোন। গুলি বর্ষনের শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। বিদ্রোহীরা কমপ্লেক্সে প্রবেশের পর সিঁড়ি থেকে নেমে আসতে আসতে বঙ্গবন্ধু বিদ্রোহীদের জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি চান?” তখনই অঝরে গুলি বর্ষন শুরু করেন ক্যাপ্টেন হুদা ও মেজর নূর৷ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একমাত্র মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেহ। শেখ মুজিবের ছেলে শেখ জামাল, জামালের স্ত্রী রোজী, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ মুজিবের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে প্রথম তলায় বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর আবদুল আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেমুদ্দিন তাদের সবাইকে বাথরুমের ভিতরে গুলি করে হত্যা করে। বাদ পড়েনি ছোট্ট শিশু শেখ রাসেল। শেখ মুজিবের নির্দেশে রাসেলকে নিয়ে পালানোর সময় ব্যক্তিগত কর্মচারীসহ রাসেলকে বিদ্রোহীরা আটক করে। আতঙ্কিত হয়ে শিশু রাসেল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি মায়ের কাছে যাব।” গুলি করা হয় শেখ রাসেলকে।

রচিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়। যেই হাতে হাত রেখে স্বপ্ন দেখেছিলো বাংলাদেশ, সেই হাত নিথর পড়ে রইলো ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে। এ যেনো এক রুপকথার গল্পকেও হার মানায়৷ তবে গল্পের নায়কের কি মৃত্যু হয়? নায়কেরা তো চির অমর৷ দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদ স্পন্দনে বেঁচে আছেন গল্পের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এক মুজিবের স্বপ্ন আজ লাখো মুজিব সেনাদের উজ্জীবিত করে। সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় আজ ঘরে ঘরে৷ উৎসাহ সেই এক মুজিব৷ বাংলার ইতিহাসে হয়তো মহানায়কের আগমন আর ঘটবেনা, তবে শ্রদ্ধা আর উৎসর্গে বদলে যাবে বাংলার পটভূমি। অনুপ্রেরণা হয়ে রইবে লক্ষ মানুষের পথচলায়৷ গল্পটি যদি সিনেমার হতো, তবে হয়তো সেদিন হাসতে হাসতে সিঁড়ি থেকে নামতেন বঙ্গবন্ধু। “আপনি কি চান?” বলার পরিবর্তে হয়তো হেসেই বঙ্গবন্ধু বলতেন, “আজ এক মুজিবকে মেরে লক্ষ কোটি মুজিব সৃষ্টি করলে তোমরা৷ কতো মুজিব দমিয়ে রাখবে তোমরা? প্রতিটা মুজিব এক একটা বাংলাদেশ। কতোবার বাংলাদেশকে দমিয়ে রাখবে তোমরা?”

লেখাঃ মুহতাসিম ফাহাদ মাহিন

সোর্সঃ উইকিপিডিয়া

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রয়াণ চ্যানেল আগামী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধা।।