মাছের রক্ত খেয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করে যে মানবেরা!

49

 এস্কিমো

বরফের রাজ্যে মানুষের বাস। ক্ষিধে পেলে কাঁচা মাংস আর মাছ, তৃষ্ণায় মাছের রক্ত বা বরফ গলিত পানি। অতিঠান্ডা থেকে বাঁচতে গুম্বজাকার বরফের ঘর, পানির অভাবে নেই গোসল বছরের পর বছর। কুকুর চালিত সমতলের গাড়ি কিংবা তিমি-সিল শিকারের গল্পে দেওয়া পাড়ি। পশুর চামড়ায় আবৃত থেকে উষ্ণ থাকার চেষ্টা,  শতাব্দীর পর শতাব্দী হাসিখুশি আর সাহসিকতার নিষ্টা। 

পৌরাণিক ধর্মীয় বিশ্বাসে স্থিতি আর নিজেদেরই আলাদা সংস্কৃতি। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিংবা মাটি বিহীন সমুদ্রের উপর জমিত হওয়া বরফে বাস। এসকল আলাদা বৈশিষ্ট্যই পৃথিবীতে তাদের নিজস্বতা তুলে ধরে যা হয়তো তাদের পূর্বপুরুষদের হাতে গড়া হয়েছিলো প্রায় দশ হাজারের ও বেশী সময় ধরে।

এস্কিমো শব্দটি এসেছে “আইসকিমিউ” থেকে যার অর্থ এমন একজন ব্যক্তি যে বরফে চলার জুতা পড়েছে। এছাড়া এস্কিমো শব্দটি “হাস্কি” শব্দটির সাথে সম্পর্কিত যেটি মূলত কুকুরের একটি জাতের নাম। উৎপত্তিগতভাবে এর কোন নীচ জাতীয় শব্দ নেই। কানাডা এবং গ্রিনল্যান্ডে এস্কিমো শব্দটি মর্যাদাহানিকর হিসেবে দেখা হয় বিধায় ব্যাপকভাবে “ইনুইট” শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে, যার অর্থ মানুষ এবং এটি মূলত কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। 

উত্তর আমেরিকায় এস্কিমো শব্দের অর্থ “কাঁচা মাংসখেকো”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাই আইন করে বাদ দেওয়া হয় এই এস্কিমো শব্দটিকে। এস্কিমোরা নিজেদেরকেই ইনুইট নামে পরিচয় করাতে পছন্দ করে। শোনা যায়, পর্যটকদের মধ্যে কেউ তাদের এস্কিমো ডাকলে তারা অত্যন্ত রাগান্বিত হয়।

ইতিহাসঃ

এস্কিমোরা ঐতিহ্যগতভাবে রাশিয়ার সাইবেরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা, কানাডা ও  গ্রীনল্যান্ডে বসবাস করলেও তাদের উৎপত্তি সম্পর্কে ছোটখাটো মতবিরোধ রয়েছে। 

প্রাচীনতম জনপ্রিয় প্রত্নতাত্ত্বিক ওয়েবসাইট গুলোর মধ্যে ল্যাব্রেডোরের “সেগলেক বে” পাওয়া যায়, যাতে প্রায় ৩৮০০ বছর পূর্বে তারিখের কথা বলা হয়। 

আবার আরেকটি আলেউশিয়ানদের “উনমক দ্বীপে” পাওয়া যায় যাতে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বের কথা বলা হয়। 

এস্কিমো লোকেরা আমেরিকান, উত্তর ইউরোপ সহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পৃথক। ভাষা, সংস্কৃতি বিবেচনা ও গবেষণায় অন্তত এটি বিশ্বাস করা হয় যে এস্কিমো জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ অন্যান্য আদিবাসী আমেরিকান থেকে একেবারেই আলাদা উৎস। 

আবার ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকবিদেরা মনে করেন এরা এশিয়ার মঙ্গোলীয় জাতির বংশভূত এবং বহু বছর আগে এশিয়া থেকে এইসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো পর্যন্ত পাওয়া সকল তথ্যের ভিত্তিতে এই তথ্যটি সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত মনে হয়। এছাড়াও অনেকে বিশ্বাস করেন এই এস্কিমোরা ১০,০০০ বা ১৫,০০০ বৎসর পূর্ব থেকে এইসব অঞ্চলগুলোতে বসবাস করা শুরু করে। 

তবে যত মতো বিরোধী থাকনা কেন ক্ষুদ্রনীগোষ্ঠী হিসেবে এবং বরফের রাজ্যে শিকারে জীবন-যাপনে তাদের যেমন রয়েছে একেবারে ভিন্ন শারীরিক অবকাঠামো তেমনি আধুনিক পৃথিবীর তুলনায় তাদের সংস্কৃতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

অবস্থান ও জনসংখ্যাঃ

অবস্থান বলতে বরফের রাজ্যগুলোতে এদের বাস। উত্তর আমেরিকার আলাস্কা, রাশিয়ার সাইবেরিয়া, কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করে। এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে পছন্দ করে এবং কোন খাবারের সন্ধান পেলে তা ভাগাভাগি করে খেয়ে থাকে।

ধারণা করা হয় এস্কিমো বংশোদ্ভূত ১৮৩০০০ বা এরও বেশি মানুষ বর্তমানে জীবিত রয়েছে। যার মধ্যে উত্তর আমেরিকার আলাস্কায় প্রায় ৮৫০০০, গ্রিনল্যান্ডে প্রায় ৫০০০০ এবং অন্যান্যরা রয়েছে কানাডা ও সাইবেরিয়ার অঞ্চলগুলোতে।

ভাষাঃ

এরা সাধারণত কোন নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে না বিভিন্ন অংশের এস্কিমোরা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে থাকে যেমন এরা রাশিয়ান, ইংরেজি, ফ্রেন্স, ডেনিশ, গ্রীনল্যান্ডিক ভাষায় কথা বলতে পারে। এছাড়াও তাদের অনেকগুলো আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে যার মাধ্যমেও অধিকাংশ এস্কিমোরা কথা বলে থাকে। কেউ কেউ একেবারে ভিন্ন ভাষায় কথা বলে থাকে, এই ভাষাকে সাধারণত এস্কিমো-ইনুইট ভাষা বলা হয়।

ধর্মঃ

পুরনো ঐতিহ্য, ধারণা ও পৌরাণিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে এদের ধর্মীয় বিশ্বাস গড়ে ওঠে। সবারই প্রান আছে এমনকি পাথর ও বরফেরও প্রাণ আছে বলে এদের ধারণা, একারণে এদেরকে ধর্মে সর্বপ্রাণবাদী বলা হয়।

এস্কিমোরা বিশ্বাস করে তাদের অসুস্থতার কারণ হলো শরীর থেকে আত্মা সাময়িক সময়ের জন্য চলে যাওয়া। তাছাড়া শরীর থেকে আত্মা যখন একেবারের জন্য চলে যায় তখন তাদের শারিরীক মৃত্যু অর্থাৎ এস্কিমোদের মৃত্যু ঘটে। 

আবার তারা বিশ্বাস করে এস্কিমোরা যখন মারা যায় তখন তাদের আত্মাগুলো অশরীরী হয়ে ঘুরে বেড়ানোর সাথে সাথে জীবিত মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এই যে ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এরা নবজন্ম নেওয়া শিশুর নাম ঐ সকল মৃত মানুষদের নামে রাখে। যার ফলে আত্মাগুলো নিজেদের বাসস্থান খুঁজে পায় এবং অন্যদের ক্ষতি করে না। এছাড়াও গ্রীনল্যান্ডের কিছু এস্কিমোরা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী।

শারীরিক গঠন ও জীবনধাঁচঃ

এস্কিমো বা ইনুইটরা সাধারণত বেঁটে হয়ে থাকে কিন্তু এরা স্বাস্থ্যবান ও হাসিখুশি। লম্বায় প্রায় ৫ ফুট থেকে ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে, এদের চুল কালো এবং নাক চ্যাপ্টা আকারের হয়ে থাকে। গায়ের রং হালকা বাদামি হলেও ময়লাটে ধরনের পানির অভাবে গোসল করতে পারে না বলে ময়লা জমে থাকে শরীরে, ফলে ধীরে ধীরে কালো হতে থাকলে এরা পরস্পরের গা চেঁটে ময়লা পরিষ্কার করে থাকে। 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়। এরপর মূলত ঘরের রান্না-বান্না সহ চামড়াকে পোশাকে পরিণত করা, বাচ্চা লালনপালন করা এবং বাড়ির কাজ করাই মেয়েদের মূল কাজ। 

অপরদিকে পুরুষদের জীবনযাপন মূলত শিকারি। খাবার সংগ্রহ ও হিংস্র প্রাণীদের থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যই প্রতিটি ইনুইটরা শিকারী হয়ে ওঠে। 

এদের বিয়ের একটি অদ্ভুত প্রথা চালু আছে বিয়ের পূর্বে কনেকে বেঁধে রাখা হয় এক প্রকার অপহরণের মতো এবং হবু বরকে অপহরণকারীদের পরাজিত করে কনেকে ছাড়িয়ে আনতে হয়। প্রচলিত সমাজের মত কোন যৌতুক প্রথা চালু নেই এস্কিমোদের। হাসিখুশি আর দলবদ্ধ জীবনযাপনে কাঁটিয়ে দিচ্ছে যুগের পর যুগ।

পোষাকঃ

পোশাক তৈরির জন্য পশুর চামড়াই এদের একমাত্র অবলম্বন। পশুর চামড়ার মাধ্যমে ওরা একপ্রকার পোশাক তৈরি করে যার নাম “ক্যারিবো ফারস” যা চরম শীতের বিরুদ্ধেও তাদের সুরক্ষা দেয়। এছাড়াও বিশেষ প্রাণীর চামড়া দিয়ে “পারকা” নামক এক ধরনের পোশাকও তৈরি করে। এতে শক্তিশালী পোশাক থাকার পরেও শীতকালীন তাপমাত্রা সাথে পরাজিত হয়ে বাসায় বসে থাকতে হয় ফলে এ সময় খাবারের জন্য তাদের গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত শিকার করে খাবার জমা রাখতে হয়। অতিরিক্ত ঠান্ডা পড়ে বিধেয় এসকল খাবার গুলো নষ্ট হয়ে যায় না। সংরক্ষিত থাকে মাসের পর মাস।

ইগলু নামের গুম্বজাকার কুটিরঃ

ইগলু

ছোটবেলায় বইয়ে পড়তাম ইগলু। ইগলু মানে বরফের ঘর। হ্যাঁ, এটাই সেই ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় মুখ বোলানো বরফের ঘর। অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে তাদের তৈরি বরফের ঘর গুলোই তাদেরকে বাহিরের ঠান্ডা থেকে রক্ষা করে।

সাধারণত বরফখণ্ড কেটে কেটে তা দিয়ে এক প্রকার গুম্বজাকার বা উল্টো করে রাখা বাটির মতো ঘর তৈরি করা হয়। বরফখণ্ড গুলো একের পর এক বসিয়ে শুধুমাত্র একটি দরজা ছাড়া পুরো ঘর বায়ুরোধী থাকে, আর দরজার অনেক ছোট বলে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করতে হয় ঘরে। আবার ভিতরে সিল মাছের চর্বি দিয়ে তৈরি তেলের প্রদীপ জ্বালানো হয় বলে ভিতরটা উষ্ণ থাকে আবার বায়ুরোধী হওয়ায় গরম ভাপ বাহিরেও যায় না। অন্যদিকে বরফও গলে যায়না কারণ, বাহিরের তাপমাত্রা -১৫ থেকে -৩২ হয় সাধারণত। এ ধরনের ঘরে ৪ থেকে ৬ জন অনায়াসেই থাকতে পারে। 

এই ঘরকে তুষারঘর, বরফের ঘর, এস্কিমোদের ঘর নামেও ডাকা হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা একটু বাড়লেই এস্কিমোদের বাড়িগুলো গলে যায়। ফলে খোলা আকাশের নিচে যেমন খুশি আকারে তাঁবু তৈরি করে তাদের বাসস্থান তৈরি করতে হয়। তাদের তৈরি তাবুগুলোর ছাদ হিসেবে থাকে পশুর চামড়া আর দেওয়াল হিসেবে থাকে পশুর হাঁড় ও বড় বড় মাছের (সিল, তিমি) বিশালাকৃতির কাঁটা।

বছরে একরাত একদিনঃ

কেমন হতো যদি দিনের পর দিন – একটানা দিন তারপর এক টানা রাত আসতো? হ্যাঁ, এস্কিমোদের অভিজ্ঞতাটা কিছুটা এরকম। একটানা ৬ মাস দিন থাকার পরে রাত আসে তাও আবার অবশিষ্ট ৬ মাসের জন্য। মেরু বৃত্তের ভিতরের অংশগুলোতে যখন সূর্যের মধ্যভাগ বা চাকতির মুক্ত দিগন্তের নিচে চলে যায় তখন একটানা দিন বা একটানা রাতের ঘটনাগুলো ঘটে থাকে অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে যদি একটানা রাত থাকে তখন দক্ষিণ গোলার্ধে একটানা দিন। একটানা রাতকে বলা হয় পোলার নাইট বা মেরু রাত্রি। বছরে একবার সূর্যোদয় এবং একবার এই সূর্যাস্ত দেখা যায় সেখানে। 

গ্রীষ্মকাল টানা ১৮৭ দিন স্থায়ী হয়, এসময় সার্বক্ষণিক সূর্য আকাশে থাকে বলে এসময়কে একটানা দিন বলা হয়। গ্রীষ্মের পর আসে শীতকাল যা স্থায়ী হয় অবশিষ্ট ১৭৮ দিন। এসময় আকাশে সূর্যের দেখা মিলেনা বলে এসকয়কে একটানা রাত বলা হয়। দিনে কিংবা রাতে খাবারের সন্ধানে বের হতেই হয় তাদের। যেহেতু শীতকালে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা আবার অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকে তাই শীতকালীন খাবার জোগাড়ের জন্য তাদের গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় । 

আলোর উৎস বলতে সিল মাছের চর্বি থেকে একপ্রকার তেল সংগ্রহ করে ব্যবহার করে। এই চর্বি বা তেলগুলোই জ্বালিয়ে তারা ঘরের ভেতর যেমন উষ্ণ রাখতে পারে, তেমনি শীতকালীন একটানা রাতের পরিস্থিতিও মোকাবেলা করে থাকে।

দুই ঋতুতেই বারো মাসঃ

“গ্রীষ্ম ও শীত” মাত্র এই দুটোই ঋতু রয়েছে তাদের। দুটো ঋতু থাকা সত্ত্বেও এখানে সারা বৎসরই বরফে গেরা থাকে উত্তর মেরুর এই অংশগুলো। গ্রীষ্ম ঋতুতে এখানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস আবার শীতকালে তাপমাত্রা থাকে – ১৫ থেকে -৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্রীষ্মকালে সূর্য আকাশে দেখা দিলেও নেই অতিরিক্ত তাপ। আবার যেহেতু তাপ থাকেনা তাই বাষ্পীভবনের প্রশ্নই উঠে না ফলে আকাশে নেই মেঘ-বৃষ্টির খেলা। 

মূলত, গ্রীষ্মে সূর্য কখনোই মাথার উপরে উঠে না, এক আকাশে হেলে থাকে। ঋণাত্মক তাপমাত্রা এখানে সারাবছরে চাপা পড়ে থাকে যাতে বসবাস ইনুইট বা এস্কিমোদের। 

বর্তমানে গবেষকরা ব্যপুল গবেষণায় আরো দুটো ঋতুর সন্ধান পেয়েছে সেখানে। যার একটি শরৎ অন্যটি বসন্ত কিন্তু এগুলোর ব্যাপ্তিকাল অত্যন্ত কম, সর্বোচ্চ সপ্তাহ খানেক। 

শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও গ্রীষ্ম আসার আগে প্রবল তুষার ঝড় বয়ে যায় সমস্ত উত্তর মেরুতে এতে এস্কিমোদের জীবন-যাপনে পর্যাপ্ত আঘাত হানে।

বাঁচার জন্য শিকারী জীবনঃ

বরফে ঢাকা বিশালতার মাঝে নেই কোন মাটি ফলে নেই কোন গাছপালা, ফলমূল, শাকসবজি বা ফসল। খাবার বলতে শিকার করা পশুপাখি বা সামুদ্রিক মাছ আর পান করে সিল মাছের রক্ত এবং বরফ গলানোর পানি। 

এখানে রয়েছে বলগা হরিণ, ভাল্লুক, পেঙ্গুইন, খরগোশ, ভেড়া, শিয়াল আর কুকুর। এছাড়াও মাঝেমধ্যে রাজহাঁস দেখা যায়, এসব শিকার করতে পারলেই খাবার জুটে মাংসের। তাছাড়া সারাবছরই মাছ ধরে খাবার যোগায় এস্কিমোরা। মাছের মধ্যে সিল, তিমি, তিমি ব্লুবার, ওয়ারলাস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

শিকার করার জন্য তারা নিজেদের তৈরি বিশেষ ধরনের বর্শা, তীর ছাড়াও হাতির দাঁত ব্যবহার করে। প্রায় অধিকাংশ অস্ত্রগুলোই তৈরি হয় পশুর দাঁত বা বিশালাকৃতির মাছের কাঁটা থেকে।

মাঝেমধ্যে হিংস্র পশু শিকার করতে গিয়ে নিজেদের বিপদের মধ্যে পড়তে হয়, তবুও এই শিকারি জীবনই তাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। 

সিল মাছ ধরার জন্য এক অদ্ভুত রকমের টেকনিক প্রয়োগ করে এরা। বরফের গর্ত খুঁড়ে একেবারে সমুদ্র পর্যন্ত আর হারপুন নামক তীর নিয়ে অপেক্ষা করে ঘন্টার পর ঘন্টা গর্তের পাড়ে। যখনি সিল মাছ গর্ত থেকে মুখ বের করে শ্বাস নেওয়ার জন্য, তখনই সেটাকে হারপুন তীরে বিদ্ধ করে শিকার করে। এই তীরের ৩ টি অংশ থাকে, যার একটি মছকে আঘাত করে এবং অন্য দুটি ব্যবহৃত হয় যাতে মাছ পালাতে না পারে।

এছাড়া গ্রীষ্মকালে সূর্য উঠলে কোথাও কোথাও ঘাস জন্মায়। যা খেয়েও ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা চালায় এস্কিমোদের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ।

যানবাহনঃ 

  • কায়াক নৌকাঃ এরা যখন নদীতে শিকারের জন্য যায় তখন কায়াক নামক নৌকা ব্যবহার করে থাকে। এটি ছোট ধরনের নৌকা, এক বা দুজন নৌকায় চড়ে মাছ শিকারে যায়। 
  • উমিয়াক নৌকাঃ উমিয়াক নৌকা লম্বায় প্রায় ১২ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ ধরনের নৌকা সাধারণত মালামাল পরিবহন, লোক আনা-নেওয়া বা অন্যান্য জিনিসপত্র পরিবহনে ব্যবহার করে থাকে। এই নৌকার তলদেশ সমান থাকে, ফলে সহজেই বরফের তীরে নৌকা ভিড়াতে পারে।
  • কুকুরের গাড়ি বা স্লেজঃ সারা বিশ্ব যখন অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক গাড়ি আবিষ্কার হচ্ছে সেখানে সড়ক পথে বা বরফে চলাচলের জন্য এস্কিমোরা ব্যবহার করে কুকুরের গাড়ি। পশুর চামড়া, শক্ত হাড় ইত্যাদি সাধারণ জিনিসে তৈরি করা হয় স্লেজ। পরে তার সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের গলায়। এতে তেল-গ্যাস বা ইঞ্জিন কিছুরই প্রয়োজন হয়না। উত্তর মেরুর কুকুরগুলো সাধারণত কুকুরের মত নয়, এদের গায়ের লোম সাধারণ কুকুরের থেকেও অনেক বেশি ঘন ও পুরু এবং এরা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে থাকে। এরা অনায়াসেই ৮ থেকে ১০ ঘন্টা দৌড়াতে পারে খাবার না খাওয়া ছাড়া। এ সকল কুকুরগুলোকে এস্কিমোরা বাড়িতেই পালন করে থাকে কিন্তু এদের খাবার কম দেওয়া হয়। কারন এস্কিমোদের ধারনা খাবার যদি বেশি দেওয়া হয় তাহলে কুকুরগুলো অলস হয়ে যাবে। আর স্লেজ টানা থেকে বিরত হয়ে যাবে।

সময়ের কোনো হিসাব নেইঃ

দিনরাত বলতে বছরে একবার করে আসে, তাই এখানে সময়ের কোনো হিসাব নেই তবে পর্যটকরা যে দেশ থেকে যায় সে অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পর am বদলে গিয়ে pm আসা কথা থাকলেও মেরু অঞ্চল ঘূর্ণন অক্ষের পৃষ্ঠতলে বলে সূর্য ডুবে যায় না টানা ৬ মাস ধরে। ফলে এখানে সময়ের হিসাব করা বা নাকরা একই ব্যাপার।

ইনুইট আর্টঃ

ইনুইট আর্ট দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ। গ্রিনল্যান্ডে যারা ভ্রমণ করে থাকেন তাদের প্রায়ই ইনুইট আর্টের একটা অংশ ক্রয় করতে আগ্রহী হয়। এই শিল্পটি টিউপিলাক নামে পরিচিত। শিল্পের সাথে যাদুবিদ্যার সম্পর্ক রয়েছে বলে তাদের ধারণা এবং ইনুইটের অনেকেই টিউপিলাক নামক এই শিল্পে জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছে।

উত্তরমেরু বা মেরু অঞ্চলেই পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ বরফ জমে আছে, শুধু তাই ই নয় পৃথিবীর মোট সুপেয় পানীর প্রায় ৭০ ভাগ রয়েছে এই মেরু অঞ্চলেই। এই মেরু অঞ্চলের সব বরফ গলে গেলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা দাঁড়াবে অতিরিক্ত ২০০ ফুট। যা ২০ তলা বাড়ির সমান।

পৃথিবীর উষ্ণতা দিনদিন বাড়ছে। বাড়ছে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমান ও পরিবেশ দূষনের মাত্রা। তাছাড়া যে হারে গাছপালা কেটে নিধন করা হচ্ছে, পরিবেশকে তার ক্ষতস্থানগুলোকে  পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। যার ফলাফল চোখ বন্ধ করে উপলব্ধি করা না গেলেও বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যতবাণীর মধ্যে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। কার্বন নিঃসরণের পরিমান যদি সম্প্রতি আমরা না কমানোর পদক্ষেপ নেই, তাহলে ভেসে যাবে সমতল ভুমি আর বেঁচে থাকার মতো গাছফালা-উদ্ভিদ। ফলস্বরূপ আমরা পাবো এক অথৈ জলের পৃথিবী। আর আমাদের কৃতকর্মের ফল প্রত্যক্ষ ভোগ করতে হবে ইনুইট বা এস্কিমোদের। গড় তাপমাত্রা যত বাড়তে থাকবে ততো বরফ গলা শুরু হবে আর ধংসের মুখে পড়বে এস্কিমোদের জীবনবসতি।

লিখেছেনঃ আল জোবায়ের আলিম