ভারতবর্ষের প্রথম গ্র‍্যাজুয়েট এক বাঙালি সন্তান!

শুধু বাঙালিদের মধ্যেই নয়, সারা ভারত বর্ষের মধ্যে প্রথম গ্র‍্যাজুয়েট এক বাঙালি সন্তান, 'বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়'।

25

আজ ২৬ জুন। বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম বাংলা উপন্যাসের জনক, সাহিত্য সম্রাট,  ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’র আজ জন্মদিন।  

১৮৩৮ সালের ২৬ জুন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটি শহরের নিকটস্থ কাঁঠালপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অবশ্য তাঁদের আদিনিবাস ছিল হুগলি জেলার দেশমুখো গ্রামে। 

তাঁর পিতার নাম যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী। বঙ্কিমেরা চার ভাই ছিলেন। শ্যামাচরণ, সঞ্জীবচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র এবং পূর্ণচন্দ্র।  তাঁর ভাই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও বাংলা সাহিত্যের একজন সাহিত্যিক।  

বঙ্কিমের জন্মকালে তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সদ্য অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার ডেপুটি কালেক্টর পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

শিশু বয়সেই তাঁর অসামান্য মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। পাঁচ বছর বয়সেই হাতে খড়ি হয় কুল-পুরোহিত বিশ্বম্ভর ভট্টাচার্যের কাছে। 

বঙ্কিমের ছোটভাই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

“শুনিয়াছি বঙ্কিমচন্দ্র একদিনে বাংলা বর্ণমালা আয়ত্ত করিয়াছিলেন। যদিও গ্রামের পাঠশালায় বঙ্কিম কোনওদিনই যান নি। “

অর্থাৎ, গ্রামের পাঠশালাতে যে এর আগে যাইনি কখনো, পাঠশালার পাঠ নেয়নি কখনো সে একদিনে বর্ণমালা আয়ত্ত করে পাঠশালারই পাঠে গড়গড় করে বলছে। এটা সত্যিই অসাধারণ মেধাবী না হলে পারা যায় না৷  

১৮৪৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র পিতার কর্মস্থল মেদিনীপুরে চলে আসেন, সেখানেই তাঁর প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয়। মেদিনীপুরের ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনৈক এফ টিডের পরামর্শে যাদবচন্দ্র শিশু বঙ্কিমকে তাঁর স্কুলে ভর্তি করে দেন। এখানেও বঙ্কিম অল্পকালের মধ্যেই নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। 

তাঁর ভাই পূর্ণচন্দ্র লেখেন,

” একবার বার্ষিক পরীক্ষার ফলে সন্তুষ্ট হয়ে টিড সাহেব বঙ্কিমকে ডবল প্রমোশন দিতে উদ্যত হলে যাদবচন্দ্রের হস্তক্ষেপে তিনি নিরস্ত হন”।

তাহলে দেখা যায় তিনি ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধাবী ছিলেন। তিনি এতোটাই মেধাবী ছিলেন যে, তারই স্কুল শিক্ষক তাকে তার সফলতার জন্য ডবল প্রমোশন দিতে চেয়েছিলেন। 

১৮৪৭ সালে এফ টিড ঢাকায় বদলি হয়ে গেলে সিনক্লেয়ার তার স্থলাভিষিক্ত হন; তার কাছেও বঙ্কিম চন্দ্র প্রায় দেড় বছর ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

১৮৪৯ সালে বঙ্কিমচন্দ্র পুনরায় কাঁঠালপাড়ায় ফিরে আসেন। এসময় কাঁঠালপাড়ার শ্রীরাম ন্যায়বাগীশের কাছে বঙ্কিম বাংলা ও সংস্কৃতের শিক্ষা নেন। বঙ্কিমচন্দ্র খুব ভালো আবৃত্তিকারও ছিলেন। সংবাদ প্রভাকর ও সংবাদ সাধুরঞ্জন নামক সংবাদপত্রে প্রকাশিত বহু কবিতা তিনি তাঁর অল্প বয়সেই কণ্ঠস্থ করে ফেলেন। 

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত বিদ্যাসুন্দর কাব্য থেকে বিদ্যার রূপবর্ণন ও জয়দেব প্রণীত গীতগোবিন্দম্ কাব্য থেকে ধীরে সমীরে যমুনাতীরে কবিতাদুটি তার পছন্দের ছিল। তিনি প্রায়ই কবিতা দুটি আবৃত্তি করতেন। 

এছাড়াও পণ্ডিত হলধর তর্কচূড়ামণির কাছে তিনি মহাভারত নিয়েও পড়াশুনা করেছিলেন। হলধর তর্কচূড়ামণিই তাকে শিক্ষা দেন — “শ্রীকৃষ্ণ আদর্শ পুরুষ ও আদর্শ চরিত্র”। এই শিক্ষা তার পরবর্তী জীবনে রচিত নানা রচনাতে প্রতিফলিত হয়েছিল।

এর কিছুদিন পর ১৮৪৯ সালে হুগলি কলেজে যেটি বর্তমানে হুগলী মহসিন কলেজ নামে পরিচিত তিনি তাতে ভর্তি হন। 

এখানে তিনি সাত বছর পড়াশোনা করেন। হুগলি কলেজ পড়াকালীন ১৮৫৩ সালে জুনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে মাসিক আট টাকা বৃত্তি লাভ করেন। আবার এই বছরেই সংবাদ প্রভাকরে কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কুড়ি টাকা পুরস্কার লাভ করেন। হুগলি কলেজ অধ্যয়নকালেই বঙ্কিমচন্দ্র কবিবর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর ও সংবাদ সাধুরঞ্জনে গদ্য-পদ্য রচনা আরম্ভ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর বহু রচনা এই দুই কাগজে প্রকাশিত হয়।

হুগলি কলেজ ১৮৫৬ সালে সিনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় সব বিষয়ে বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করে তিনি দুই বছরের জন্য আবারো বৃত্তি লাভ করেন। এই বছরই তিনি হুগলি কলেজ ছেড়ে আইন পড়বার জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। 

১৮৫৭ সালে জানুয়ারী মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রবর্তন করেন। আর এবারো তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের আইন বিভাগ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। 

পরের বছর অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো বি.এ. পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। 

প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় মাত্র তেরোজন ছাত্র অংশগ্রহণ করেছিলেন।  আর তাতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন মাত্র দুজন— বঙ্কিমচন্দ্র ও যদুনাথ বসু। আবার, বঙ্কিম সে দুজনের মধ্যে প্রথমস্থান লাভ করেছিলেন। 

সুতরাং, বঙ্কিমচন্দ্র হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র‍্যাজুয়েট অর্থাৎ বি. এ.। শুধু, বাঙ্গালিদের মধ্যেই নন সারা ভারতবর্ষের মধ্যে তিনিই হলেন প্রথম গ্র‍্যাজুয়েট। যে গল্পটা আমরা অনেকেই জানি না। আর এটি ছিল এক অনন্য ঐতিহাসিক সম্মান। 

পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক কারণেই তিনি সরকারি চাকুরি পেয়ে যান। 

১৮৫৮ সালে ৬ আগষ্ট তিনি বাংলা সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন। তিনি সারা জীবন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথেই কাজ করে গিয়েছেন। চাকুরিজীবনে তিনি বাংলা সরকারের  অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পর্যন্ত হয়েছিলেন। সেসময় বাঙ্গালিদের মধ্যে এত উঁচু পদে কেউ কাজ করেন নি। শিক্ষা দীক্ষার গুণে তাঁর ভাইয়েরা প্রত্যেকেই ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। 

তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে দুটি খেতাবে ভূষিত করে — ১৮৯১ সালে ‘রায় বাহাদুর’ খেতাব এবং ১৮৯৪ সালে ‘কম্প্যানিয়ন অফ দ্য মোস্ট এমিনেন্ট অর্ডার অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ খেতাব। 

তবে সরকারি কর্মকর্তা নয় বরং লেখক এবং বাঙলা তথা সমগ্র ভারতের নবজাগরণের অন‍্যতম মুখ হিসেবেই তিনি অধিক প্রখ্যাত। 

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বিয়ে হয় ১৮৪৯ সালে। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১১ বছর। নারায়নপুর গ্রামের মাত্র পাঁচবছর বয়সী এক বালিকার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু চাকুরি জীবনের শুরুতে যশোর অবস্থান কালে ১৮৫৯ সালে এ পত্নীর মৃত্যু হলে,  ১৮৬০ সালের জুন মাসে হালিশহরের বিখ্যাত চৌধুরী বংশের কন্যা রাজলক্ষী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বঙ্কিমের তিন মেয়ে, তাঁদের কোন পুত্র সন্তান ছিল না।

বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৮৬৫ সালে দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশিত হয়। যা ছিলো বাংলা সাহিত্যের  ‘ প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস ‘। তবে এটিকে প্রথম উপন্যাস বলা যাবে না৷ কারণ, বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস লেখেন, প্যারীচাঁদ মিত্র। ‘আলালের ঘরে দুলাল’।

আমাদের সাহিত্য ভান্ডারে উপন্যাস ছিল না। আমরা চিনতাম না উপন্যাস কি….  বঙ্কিমচন্দ্রই উপন্যাস কি জিনিস তা আমাদের দেখান, বাংলা সাহিত্যকে দেখান। আমাদের বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের জন্মদাতা তিনি। ইংরেজি নভেলের আদর্শে তিনি বাংলা উপন্যাস লেখেন। তবে তাতে শুধু ইতিহাস মিশ্রিত গল্পই ছিল না, ছিল মানুষের কীর্তিকলাপ, মানুষের কথা ,মানুষের ব্যাথা৷ 

 বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মোট ১৫টি উপন্যাস লিখেছিলেন এবং এর মধ্যে একটি ইংরেজি ভাষার উপন্যাস ছিলো। 

বঙ্কিমই বাংলা ভাষাকে প্রথম সত্যিকারের মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাঁর রচনা ‘বঙ্কিমী শৈলী’ বা ‘বঙ্কিমী রীতি’ নামে পরিচিত।

তাঁর বিখ্যাত কিছু উপন্যাস গ্রন্থ— 

কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ, ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয়, চন্দ্রশেখর, রাধারানী, রজনী, কৃষ্ণকান্তের উইল, রাজসিংহ, আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরানী, সীতারাম। 

ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয় ও রাধারানী কে বলা হয় তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস। বঙ্কিম রচিত ইংরেজি উপন্যাস  Rajmohan’s Wife ও সাহিত্য জগতে ব্যাপক সাড়া ফেলে। 

প্রবন্ধ গ্রন্থ—

কমলাকান্তের দপ্তর, লোকরহস্য, কৃষ্ণ চরিত্র, বিজ্ঞানরহস্য, বিবিধ সমালোচনা, প্রবন্ধ-পুস্তক, সাম্য,  কৃষ্ণ চরিত্র, বিবিধ প্রবন্ধ, মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত।

তবে বঙ্কিমের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ একটি কাব্য, নাম ‘ললিতা’। আবার তিনি একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, পত্রিকাটির নাম বঙ্গদর্শন। ১৮৭২ সালে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।  

শেষ জীবনে তাঁর স্বাস্থ্য বিশেষ ভালো ছিল না। ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে তার ডায়াবেটিস রোগ বেশ বেড়ে যায়। এই রোগেই অবশেষে তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল কলকাতায় নিজ বাড়িতেই মাত্র ছাপান্ন বছর বয়সে তিনি মারা যান।

বাংলা সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ মনিষি, বাংলা উপন্যাসের জনক, সাহিত্য সম্রাট, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’র জন্মদিনে চ্যানেল আগামী পরিবার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

ইভান পাল