বাঙালিরা কি আসলেই উৎসব প্রিয়!

18

উ ৎসবে-পরবে মনে এক অন্তরীক্ষের জগৎ গড়ে ওঠে। যেখানে পুজো উপাসনা নামাজ ব্রত নিয়ম আচারের নানা দৃশ্য আর সংলাপ তৈরি হয়। ব্যক্তি মানুষও বৃহত্তর সমাজ চৌহদ্দিতে মিলেমিশে যায়। এটাই পরবের অন্তর্ভেদী রূপ।

‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা।’

                                        – ঈশ্বর গুপ্ত   

কবি ঈশ্বর গুপ্তর কথাটা নিতান্তই নিষ্কলুষ সত্য । প্রত্যহ বাঙালির জীবনে জোঁকের মতো আঁকড়ে থাকে অনাচার-রাহাজানি, দুর্নীতি। সাংসারিক জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সহ এমন কোনো ক্ষেত্র বোধহয় বাকি নেই যেখানে অনিয়ম এবং উশৃঙ্খলতা এসে তার কালো হাত বাড়ায়নি । 

কিন্তু, সেই ইতিবাচক, নেতিবাচক ভাবনা, প্রাত্যাহিক জীবনধারা, সংস্কৃতি সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে বলতে হয় আমরা বাঙালি। 

কিন্তু ঋতুর বর্ণময় আত্মপ্রকাশের সঙ্গে বাঙালির মানসিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে নেমে আসে উৎসবের ঘনঘটা । যাকে বোদ্ধাসমাজ নাম দিয়েছে ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ ।  প্রতিটি মাসেই বাঙালির ঘরে ঘরে সদলবলে হাজির হয় নানা উৎসব-আমেজ। 

প্রাত্যহিক ঝুট-ঝামেলাকে দূরে সরিয়ে প্রতিটি মানুষই সামিল হয় উৎসবের রঙে নিজেকে এবং পরিবারকে রাঙাতে । উৎসব জীবনের ছন্দ স্পন্দ প্রতিদিনের তুচ্ছতার যবনিকা উত্তোলন আত্মার প্রসারণের চলন্তিকা উৎসব মিলন শান্তি মৈত্রীর ত্রিবেণী বন্ধন। 

বৃহৎ আঙ্গিকে বাঙালির উৎসবকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়– ধর্মীয় উৎসব ,ঋতুভিত্তিক উৎসব ,সামাজিক উৎসব এবং জাতীয় উৎসব। 

ধর্মীয় উৎসব:

বহু ধর্মের তীর্থভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। একই সাথে বসবাস করে নানা ধর্মের,নানা মতের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী । সব ধর্মের মানুষের মাঝেই রঙ ছড়ায় উৎসবের বর্ণিল ঘনঘটা ।

বাঙালিদের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ঈদের দিন শিশুদের আনন্দ;

হিন্দু ধর্মের উৎসব গুলির মধ্যে নববর্ষের সিদ্ধিদাতা গণেশের পূজা দিয়ে বর্ষারম্ব সূচিত হয়। তারপর দশহরা, রথযাত্রা, রাখি পূর্ণিমা, মনসা পূজা, বিশ্বকর্মা পূজার পর আসে হিন্দুদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। পরবর্তী অমাবস্যা তিথিতে হয় নি মুণ্ডমালিনী এলোকেশী শ্যামা মায়ের বোধন ও দীপান্বিতা উৎসব। বহুবিচিত্র আতশবাজি ও সারিসারি প্রদীপের আলোকে স্বর্গের দেবতা কে মর্তের কুটিরে বরণ করে নেবার জন্যই যেন এই দিপালী উৎসবের পরিকল্পনা। কার্তিক ও জগদ্ধাত্রী পূজার পর আসে মাঘের শ্রীপঞ্চমী তিথিতে হংস বাহনা সর্বশুক্লা দেবী সরস্বতী বন্দনা লগ্ন। বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয় অন্নপূর্ণা পূজা। 

বছরের শেষ দিকে আসে মুসলিমদের বড় দুই উৎসবের দিন-ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এছাড়াও সারা বছর জুড়ে থাকে শবে বরাত, মহররম, শবে মেরা’জ ইত্যাদি। মুসলিম ধর্মপ্রাণ সমাজে যথাযথ ভাব গাম্ভীর্যতার সঙ্গে পালিত হয়ে এসব দিনগুলো । ঈদের দিন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আনন্দ ভাগাভাগি তে শরিক হয়। 

খ্রিস্টানদের বড়দিন, গুড ফ্রাইডে, ইস্টার সাটারডে, গতানুগতিক বাঙালির জীবনকে প্রাণময় করে তোলে।

এরপর আসে বুদ্ধি পূর্ণিমা, ফানুস উড়ানো। মন্দিরে মন্দিরে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা রত হয় ভগবান বুদ্ধের আরাধনায়৷ 

বাঙালির প্রাচীন চিরাচরিত উৎসবগুলির সঙ্গে এই নবাগত উৎসব গুলি সম্মিলিত হয়ে যেমন তার উৎসবের ডালি কে সমৃদ্ধ করেছে তেমনই আনন্দ-বেদনার বিচিত্র রসে তার জীবন পাত্রকে তুলেছে কানায় কানায় পূর্ণ করে।

ঋতুভিত্তিক উৎসব:                        

চিরহরিৎ এই বঙ্গদেশ যেন বিভিন্ন ঋতুর অপার ভাণ্ডার। বাঙ্গালির প্রাণের উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’ দিয়ে বাংলা বছরের প্রথম দিনের শুভ সূচনা ঘটে। 

এরপরে, সারা বছর জুড়েই আবর্তিত হয় ঋতুদের লুকোচুরি খেলা, সাথে প্রতি ঋতুতে ঋতুভিত্তিক উৎসব।

অন্যতম প্রধান উৎসব “পহেলা বৈশাখ”।।

খরতপ্ত বৈশাখের পূর্ণ প্রভাতে শুরু হয় বাঙালির নববর্ষ উৎসব।  গ্রীষ্মের কাঠফাঁটা রোদে ” এসো হে বৈশাখ “ ধ্বনিত হয় চারদিকে। আবার কখনোবা মুষলধারে বৃষ্টি ক্ষণে বাঙালিদের সবার কন্ঠে বেজে ওঠে —

“আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে,

জানিনে, জানিনে,

কিছুতে কেন যে মন লাগেনা।”

সাথে চলে বৃক্ষরোপণ উৎসব।  শরতের আকাশ বাতাস মুখরিত করে আসে শারদীয়া উৎসব। অঘ্রাণে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধানে নবান্ন উৎসবের লাগে ধুম। পৌষ মাসে নানা স্থানে জমে ওঠে পৌষ মেলা পিঠা পার্বণ তুষ তুষালি । ফাল্গুন মাসের প্রকৃতি যখন বর্ণাঢ্য রূপসজ্জায় সেজে ওঠে তখন রঙের খেলা খেলবার জন্য আসে হোলি। তারপর চৈত্রের শূন্য পান্তরে গাজনের বাজনা বাজিয়ে পুরাতন বছর বিদায় নেয়।

জাতীয় উৎসব:

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয় বাঙালিরা। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের অধিকার অর্জিত হয়। সেই থেকে এদেশের জাতীয় জীবনে নেমে এসেছে স্বাধীনতা দিবস,বিজয় দিবস,ভাষা দিবসের মত কয়েকটি নতুন উৎসব । 

এ উৎসবগুলো বাঙালি জীবনে আবহমানকালের। মসজিদ, নামাজ, ঈদ থেকে শুরু করে, ফানুস উড়ানো, বুদ্ধ পূর্ণিমা এসব মিশে আছে বাংলাও বাঙ্গালির প্রতিদিনের জীবনে। 

একটু যদি বাঙ্গালিদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ নিয়ে বলি—

আদি যুগে ঈদ পালনে কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে লোকায়ত বিশ্বাসের প্রভাব ছিল। পরে তাতে কিছু ধর্মীয় রীতি-নীতি যুক্ত হয়। বর্তমানে উৎসব দুটি যতটা গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হচ্ছে, আগে সেভাবে হতো না। কারণ তখন ঔপনিবেশিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ছিল, সাথে ছিল জনগণের দারিদ্র্য এবং ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা।

মুঘল আমলে ঈদের দিন হৈ চৈ বা আনন্দ হতো। তবে তা আবার বহিরাগত উচ্চপদস্থ এবং ধনাঢ্য মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তখন ছিল জাত পাত নিয়ে মানুষে মানুষে ব্যবধান। তবে মুঘলরা যে ঈদের দিনকে গুরুত্ব দিতেন তা বোঝা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় শাহী ঈদগাহর ধ্বংসাবশেষ দেখে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে ঈদের আনুষঙ্গিক আনন্দ হিসেবে যুক্ত হয় একটি নতুন উপাদান ‘লোকায়ত মেলা’। ঈদের দিনের মেলা। সে ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।  

গত একশো বছরে বাঙালি মুসলমানরা যেভাবে ঈদ পালন করতেন তার বিবরণে দেখা যায়, ঈদ উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ ছিল বিশেষ ধরনের খাওয়া-দাওয়া। মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের খাবারের মধ্যে থাকত কোরমা-পোলাও, ঘরে প্রস্তুত নানা রকমের পিঠা, সেমাই ও শিউলি বোটার রঙে মাখানো জরদা। 

ঢাকায় উনিশ শতকে ঈদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে ‘ঈদ মিছিল’র কথা জানা যায়। সম্ভবত ঢাকার নায়েব-নাজিমগণ ঢাকার বিখ্যাত জন্মাষ্টমী মিছিলের অনুপ্রেরণায় এ মিছিল চালু করেছিলেন। মাঝখানে বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কয়েক বছর আগে থেকে আবার এ মিছিল চালু হয়েছে।

পরবর্তীকালে ঈদের সঙ্গে কিছু স্থানীয় উপাদান যুক্ত হয়েছে, যার অনেকগুলি এসেছে বিভিন্ন লোকাচার থেকে, যেমন ঈদের চাঁদ দেখে সালাম দেওয়া, কদমবুসি করা, মেলা ইত্যাদি বিষয়।

এরপর বাংলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব দুর্গাপূজার কথায় আসি  —

দুর্গাপূজা

ষোল শতকে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন সম্রাট আকবরের চোপদার রাজা কংসনারায়ণ, যিনি ছিলেন বাংলার দেওয়ান এবং তাহিরপুরের রাজা।  দেওয়ান হওয়ার পর কংসনারায়ণ চেয়েছিলেন মহাযজ্ঞ করতে। তখন রাজপুরোহিত ছিলেন বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্য বংশ। এ বংশের রমেশ শাস্ত্রী সে সময় সমগ্র বাংলা-বিহারে শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি রাজাকে বলেন, যে চাররকমের যজ্ঞ করার নিয়ম আছে তার কোনোটিই এ আমলে করা সম্ভব নয়; রাজা যেন বরং দুর্গাপূজা করেন; এ পরামর্শ দিয়ে তিনি দুর্গাপূজার পদ্ধতিও লিখে দিয়েছিলেন। তখন রাজা প্রায় আট-নয় লক্ষ টাকা খরচ করে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা করেন। সে থেকে বাংলায় দুর্গাপূজার শুরু। 

এতো শুধুপ্রধান দুটি উৎসব বাঙালিদের ঈদ আর পুজোর কথা বললাম। এরপর, আরো আছে — নবান্ন, জন্মাষ্টমী, মহররম, হেমন্তে নতুন ধানের পিঠা উৎসব, শীতের পিঠা উৎসব, বসন্তের বাসন্তী পুজা, বসন্ত উৎসব সহ এরকম আরো অনেক অনেক উৎসব। এর প্রায় প্রতিটা উৎসবই অনেক পুরনো। অনেক মানে অনেক। এর কোন কোনটা নাম বদলে আরো আধুনিক হয়েছে কিংবা কোন কোনটা প্রযুক্তির যুগে, প্রযুক্তির ভারে বিলুপ্তির পথে। 

বসন্ত উৎসব

যান্ত্রিক সভ্যতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির উৎসব এর মেজাজ অনেকটাই বদলে গেছে। তার অন্তরে সেদিনের মত সাড়া জাগে না। নানা গুরুভার সমস্যার চাপে তার উৎসব গুলি আজ নিষ্প্রাণ নিষ্প্রভ। নাগরিক সভ্যতার বিষাক্ত নিশ্বাসে ও পাশ্চাত্য সভ্যতার নিষ্ঠুর আক্রমণে তার  আত্মা আজ তিরোহিত। আজ তার শুষ্ক, নীরস, প্রাণহীন, যান্ত্রিকতাময় উৎসবে প্রচুর মাইক্রোফোন আসে, হিন্দি গান বাজানো হয় অসংখ্য। বহিরঙ্গ বিলাসে উৎসবের আত্মা আজ যেন গেছে হারিয়ে।

তাহলে, বোঝায় যায় যে বাঙালি উৎসব-ভক্ত। সেই আবহমান কাল থেকেই বাঙালির নামের সাথে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের নাম জড়িয়ে আছে৷ তাই বলতেই তো পারি, বাঙালি মানেই– “বারো মাসে তেরো পার্বণ প্রিয়”।।

বেঁচে থাকুক বাঙ্গালিত্ব, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকুক বাংলা ও বাঙালির সবগুলো প্রাণের উৎসব। 

লিখেছেনঃ জুলকার নাইন মাহফুজ