চীন-ভারত যোগসূত্র স্থাপনে যিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন

হিউয়েন সাঙ একজন চীনা পরিব্রাজক। পন্ডিত, ভ্রমণকারী ও অনুবাদক। তিনি চীন এবং ভারতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সাথে ভারতের ইতিহাস তার কাছে এক প্রকার ঋণীই বলা চলে।

49

ভারত ও চীন উপমহাদেশের শীর্ষ দু’টি দেশ। দুটি দেশের সীমান্তই একে অপরের একেবারে লাগোয়া। ১৯৬২ সালে চীন ভারত সীমান্তে যুদ্ধও হয় খুব ভয়াবহভাবে, যেখানে নাস্তানাবুদ অবস্থায়  ভারতের পরাজয় ঘটেছিল চীনের কাছে। 

এরপর দু দেশই সীমান্তে চুপচাপ থাকলে, মাঝে মধ্যে ঝগড়া বিবাদে জড়িয়েছেন দুই দেশের সীমান্তরক্ষীরা।  

কিন্তু ইদানিং বেশ কয়েকদিন যাবৎই সীমান্তের বিভিন্ন অংশ নিয়ে ভারত ও চীন একে ওপরের মুখোমুখি। মার-মার কাট-কাট অবস্থা। প্রতিদিনই ভারত-চীন সংলগ্ন বিভিন্ন সীমান্তে চলে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তুমুল উত্তেজনা৷ দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে হতাহতের ঘটনাও ঘটে কম বেশি। 

এখন প্রশ্ন থাকেই, ভারত ও চীনের মধ্যে ইদানিংকালের এই দ্বন্দ্ব কিংবা বিমাতা সুলভ আচরণ কি রাজা-বাদশাহের আমল থেকেই ছিল, দু দেশের মধ্যে এমন কোন পর্যটক ছিলেন না যিনি ভারত কিংবা চীন নিয়ে ইতিবাচকভাবে ভেবেছেন? 

সে প্রশ্নের উত্তরে বলতেই হয় ছিলেন। আর তিনি হচ্ছেন ‘হিউয়েন সাঙ’। ভারতের ইতিহাস যার কাছে ঋণী। যিনি ভারতের ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন সমগ্র ভারতবাসীর কাছে, চায়নাদের কাছে, এশীয়দের কাছে, সমগ্র বিশ্বের কাছে। ভারত ভ্রমণ তো চীন থেকে অনেকেই করেছেন। কিন্তু হিউয়েন সাঙ এর মতো করে ভারত-চীন নিয়ে কেউ যেমন ভাবেন নি, ঠিক তেমনি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি কেউ তুলে ধরে ভারতকে বিশ্বের কাছে তাঁর মতো করে এতো গুছানোভাবে কেউই উপস্থাপন করতে পারেন নি।

তিনি ছিলেন একজন চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী (পরিব্রাজক) , পন্ডিত, ভ্রমণকারী ও অনুবাদক। হিউয়েন সাঙকে অনেকে হিউয়েন সাং বা হুয়ান সাং বা জুয়ানজ্যাং নামেও অভিহিত করেন।

আনুমানিক ৬০২ খ্রিস্টাব্দে, লুজহু প্রদেশের বর্তমানে যেটি চীনের হিনান প্রদেশ নামে পরিচিত তাতে গৌসি টাউনের চিনহি গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা চেন হুই, শুই সম্রাজ্যের একজন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন কিন্তু রাজনৈতিক প্রতি হিংসার কারণে পরবর্তীতে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।

হিউয়েন সাঙ এর আত্মজীবনী লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কনফুসিয়াসের গতানুগতিক তত্ত্বের উপর ব্যাপক আগ্রহ এবং পারদর্শিতা তার বাবাকে অবাক করে দেয়। তিনি অন্য ভাই বোনদের মতই বাবার কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা দীক্ষা লাভ করেন। সন্তানের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা লক্ষ্য করে তার পিতা খুব অল্প বয়সেই তার এক বড় ভাইয়ের অধীনে একটা মঠে তাকে প্রেরণ করেন। সেই মঠেই তিনি আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষা গ্রহণ করতেন এবং পাশাপাশি আশেপাশের অন্যান্য মঠগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন।

৬১১ খ্রিস্টাব্দে তার বাবার মৃত্যু হলে হিউয়েন সাঙ লুয়াং প্রদেশে জিংতু বুদ্ধ আশ্রমে তার ভাইয়ের সাথে প্রায় ৫ বৎসর কাটান। ৬১৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে যখন সুই সম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ে তখন হিউয়েন সাঙ এবং তার ভাই তাং সম্রাজ্যের রাজধানী চ্যাংগানে পালিয়ে যান এবং সেখানে একটি বৌদ্ধ আশ্রমে আরো ২ বছর অতিবাহিত করেন। সেখানে দীক্ষাগুরু শীলভদ্রের কাছ থেকে অভিধর্মদা শাস্ত্র সম্পর্কে ধারণা এবং জ্ঞান লাভ করেন।

এখানকার জীবনযাত্রার প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ জাগরিত হয় এবং তিনি শ্রমণ অর্থাৎ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। 

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ২০ বছর বয়সে শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি একজন পূর্ণ শ্রমণ হলেন। এখানে সবকিছু থেমে থাকেনি, তিনি বৌদ্ধতত্ত্ব বিষয়ে বিস্তৃত পড়াশোনা করেন এবং ভারতবর্ষে গিয়ে আরো জ্ঞানার্জনের ইচ্ছা পোষণ করেন। তাই তিনি ভাইকে রেখে পুনরায় তাং সম্রাজ্যের রাজধানীতে ফিরে যান এবং সেখানে সংস্কৃত চর্চা শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি বৌদ্ধতত্ত্বের অধিবিদ্যার উপর আগ্রহী হয়ে উঠেন।

ভারতভ্রমণ

২৯ বছর বয়সে হঠাৎ তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভারতবর্ষ ভ্রমণের। কিন্তু সেই সময়ে তাং সম্রাজ্যের সাথে তুর্কদের যুদ্ধ চলছিলো। তাই তাং রাজা তাইজং সকল নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণ নিষেধ করে দিয়েছিলো। অতঃপর ৬২৯ সালে একটি স্বপ্ন দেখে ভারত যাত্রার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইউমেনে শহরের সদর দরজার বৌদ্ধ প্রহরীদের বুঝিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেকালে যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলো খুবই খারাপ। চীন থেকে ১৫ হাজার মাইল দীর্ঘ পথ কতো পাহাড় পর্বত আর মরুভূমি বিপদসংকুল অরণ্য এসব অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়া সহজসাধ্য ছিল না। 

তিনি সর্বপ্রথম কুইংঘি প্রদেশ হয়ে গৌবি মরুভূমি পার হয়ে ৬৩০ সালে তুর্পান পৌঁছান। তুর্পান থেকে ইয়ানজি ও কুচা হয়ে কিরগিজস্তান পৌঁছান। ততদিনে তুর্কদের সাথে তাং সম্রাজ্যের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। কিরগিজস্তান থেকে তুর্ক খানের সাথে সাক্ষাৎ করে বর্তমান উজবেকিস্তানে রাজধানী তাসখন্দে পৌঁছান। সেখান থেকে পার্সিয়া নিয়ন্ত্রিত সমরখন্দে এসে কিছু ধ্বংস হওয়া বৌদ্ধ স্থাপনা দেখে বিস্মিত হন। এরপর সমরখন্দ থেকে আমুদরিয়া এবং তিরমিজে এসে প্রায় ১০০০ বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর খুন্দুজ শহরে এসে সেখানকার যুবরাজ তার্দুর অন্তেষ্টিক্রিয়া দেখার জন্য কিছুকাল অবস্থান করেন এবং ধর্মসীমা নামে এক বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর নববিহার অর্থাৎ বর্তমান আফগানিস্তান এসে অনেক বৌদ্ধ মঠ এবং মহাবিশ্ব গ্রন্থের অনুসারী প্রায় ৩ হাজার  ভিক্ষু দেখেন।

 তিনি আদিনপুর মানে বর্তমান জালালাবাদ পৌঁছান এখানে এসে তিনি মনে করতে থাকেন যে তিনি ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছেন। আদিনপুর থেকে খাইবার হয়ে পেশাওয়ারে আসেন। সেখানে যে পরিমাণ বৌদ্ধ মঠ দেখেন সে তুলনায় বৌদ্ধ ভিক্ষু ছিলো না। এরপর পেশাওয়ার থেকে সোয়াত উপত্যকায় চলে যান। সেখানে তিনি চৌদ্দশ পরিত্যক্ত বৌদ্ধ মঠ দেখেন যেগুলোতে পূর্বে ১৮ হাজার ভিক্ষু ছিলো। সোয়াত উপত্যকা থেকে তিনি সিন্দু নদ পার হয়ে কাশ্মীর আসেন। কাশ্মীরে বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘাসের সাথে মিলিত হন। উল্লেখ্য, সংঘাস ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তি। কাশ্মীরে ৬৩২ থেকে ৬৩৩ সাল পর্যন্ত অন্যান্য ভিক্ষুদের সাথে মহাযান অধ্যয়ন করে কাটান। সেখান থেকে লাহোর ও মতিপুরের দিকে রওনা হয়। এই অঞ্চলের মঠ ও স্তুপ পরিদর্শনের পর তিনি ৬৩৪ সালে পাঞ্জাবের জলন্ধরে আসেন। এখান থেকে মথুরা ভ্রমণ করার পর তিনি গাঙ্গেয় উপত্যকায় চলে আসেন। ৬৩৫ সালে গঙ্গানদীর তীরবর্তী প্রায় সকল বৌদ্ধ মঠ ও স্তুপ পরিদর্শন করেন। ৬৩৭ সালে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী এবং নির্বাণ স্থান কুশীনগর পরিদর্শন করেন। এরপর বারানসি, বৈশালী, পাটালীপুত্র এবং বুদ্ধ গয়া ভ্রমণ করেন।

এরপর সাঙ বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ২ বছর যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সংস্কৃত ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেন।  নালন্দা সম্পর্কে তিনি তার ভ্রমণ বিবরণীতে লিখেছিলেন, নালন্দা এশিয়ার বৃহত্তর এবং শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে গণিত, ধর্ম-দর্শন সহ ১৫টি বিষয়ে পঠন-পাঠন চলতো।  

বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়

নালন্দা থেকে কজংগলে আসেন। সেখান থেকে ৬৩৮ সালে পুণ্ড্রনগর মানে বাংলাদেশের মহাস্থানগড় ভ্রমণ করেন এবং বর্তমান নওগাঁ জেলার সোমপুর মহাবিহারও পরিদর্শন করেন। 

তিনি বঙ্গদেশ থেকে যে তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করেন তা থেকে জানা যায়, দেশটির পরিসীমা ৪ হাজার লি যেখানে ৬ লিতে ১ মাইল হয় এবং রাজধানীর পরিসীমা প্রায় ৩০ লি। তিনি দেশটিকে ঘনবসতিপূর্ণ এবং সবধরনের খাদ্যশস্যে সমৃদ্ধ বলে মনে করেন। 

এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাপ্ত সুস্বাদু পানাসা ফল (কাঁঠাল) হিউয়েন সাঙ এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

তিনি আরো বলেন, এখানকার মানুষ বিদ্যার কদর করেন এবং এখানে প্রায় ২০টি সংঘারামে ৩ হাজারের মতো পুরোহিত মহাযান ও হীনযান মতবাদ অধ্যয়ন করেন। এখানে প্রায় ১০০টি দেবমন্দির রয়েছে। যার মধ্যে জৈন ধর্মালম্বীদের দিগম্বর নির্গ্রন্থ মন্দির সবচেয়ে বেশি। রাজধানী থেকে প্রায় ২০ লি পশ্চিমে অবস্থিত পো-শি-প সংঘারামে প্রায় ৭০০ বৌদ্ধ ভিক্ষু রয়েছে, তারা মহাযান মতে আইন বিধান অধ্যয়ন করেন।

এখান থেকে অদূরবর্তী এক বিহারে কোয়ান-তাজ-সাই বোধিসত্ত্ব এর (অবলোকিতেশ্বর) একটি মূর্তি আছে। দূর-দূরান্তের অনেক লোকজন এখানে উপবাস ও প্রার্থনার মাধ্যমে তার প করেন।

বঙ্গদেশ ভ্রমণ শেষে, তৎকালীন কামরূপের বৌদ্ধ রাজা ভাস্কর বর্মণ এর নিমন্ত্রণে রাজধানী প্রাগজ্যোতিষপুর বর্তমানে যেটি গৌহাটি নামে পরিচিত, তা ভ্রমণ করেন এবং সেখান থেকে ৯০০লি প্রশস্ত নদী পার হন। ধারণা করা হয়, এটি ছিলো করতোয়া নদী।

এরপর রাজা হর্ষবর্ধনের আমন্ত্রণে তিনি কনৌজ-এ আসেন। তাঁর ভ্রমণ বিবরণীতে রাজা হর্ষবর্ধন কে উদার, কর্তব্যপরায়ন, ন্যায় নিষ্ঠ, প্রজাবৎসল, সংস্কৃতিমনস্ক শাসক হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে। তিনি তাঁর সেই বিবরণীতে লেখেন, থানেশ্বর থেকে গঙ্গা নদী পেরিতে কনৌজে যেতে হয়। তাঁর মতে কনৌজে বহু বৌদ্ধ মঠ এবং বহু দেব-দেবীর মূর্তি ছিল, এখানে পান্থশালা (পথিকদের বিশ্রাম নেবার জায়গা), চিকিৎসাকেন্দ্রও ছিল। 

তিনি তাঁর সেই ভ্রমণবৃত্তান্তে আরো লেখেন, রাজা হর্ষবর্ষণের সুসংগঠিত মন্ত্রীপরিষদ ছিল, যেখানে ৫০ হাজার পদাতিক ছিল ও প্রায় এক লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। 

ভূমি রাজস্বের হার ছিল একের ছয় ভাগ। হর্ষবর্ধনের রাজ্যে কেউই অন্যায়ভাবে লাঞ্চিত হত না৷ তবে চুরি ডাকাতি ছিল খুব বেশি। হিউয়েন সাঙ নিজেও দস্যুর কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছিলেন।

তিনি পাটালিপুত্রের পরিবর্তে কনৌজকেই সুরক্ষিত, জনবহুল এবং সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায়, হর্ষবর্ধনের আমলে ধর্মীয় প্রথা, রীতিনীতির চর্চা খুব বেশি ছিল। তবে, কুপ্রথা, কুসংস্কারে ভর্তি ছিল পুরো সসমাজব্যবস্থা। তাতে জাত পাত বিবেচনা করা হতো, নারীদের শাস্ত্রপাঠ নিষিদ্ধ ছিল। 

হিউয়েন সাঙ তার ভ্রমণবৃত্তান্তে ভারতীয়দের উদার, ন্যায়পরায়ণ, সরলস্বভাব বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। 

এরপর তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতী, নাগার্জুনকোণ্ডা বিহার এবং পাহলভীদের রাজধানী কাঞ্চী ভ্রমণ করেন। 

সেখান থেকে ১৩০০ লি দক্ষিণে সমতট তার পর ৯০০ লি পশ্চিমে সমুদ্র তীরবর্তি তাম্রলিপ্তি তে যান। 

শশাঙ্ক এর রাজধানী কর্ণসুবর্ণও তিনি ভ্রমণ করেন এবং উড়িষ্যা হয়ে নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন।

৬৪৪ সালের কোন এক সময়ে তিনি নিজ দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। হিউয়েন সাঙ সঙ্গে করে বেশ কিছু স্বর্ন, রৌপ্য ও চন্দন কাঠ নির্মিত বুদ্ধের মূর্তি নিয়ে যান। সাথে বহুসংখ্যক বস্তা বোঝাই করে বৌদ্ধ ধর্মের দুর্লভ প্রাচীন পুঁথির ভান্ডারও নিয়ে যান। 

৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন সাঙ চীনে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। তখনও সিংহাসনে আসীন তাইজং তাকে বিভিন্ন উচ্চপদে যোগদানের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন তিনি।  বাকি জীবন বৌদ্ধ রচনার অনুবাদে সমস্ত অর্থ ব্যয় করেন এবং ৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

হিউয়েন সাঙ এর রচনাসমূহ– 

তিনি ৬৫৭ টি সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ সংগ্রহ ও অনুবাদ করেন। Si-Yu-Ki (Buddhist Records of The Western World)- হিউয়েন সাঙ এর মূল রচনার ইংরেজি সংস্করণ অনুবাদ করেছেন স্যামুয়েল বিল। 

১৮৮৪ সালে লন্ডন থেকে এটি প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬৯ সালে দিল্লী থেকে পুনর্মুদ্রণ হয়। এর বাংলা সংস্করণ “হিউয়েন সাঙ ভ্রমণ কাহিণী” অনুবাদ করেছেন খুররম হোসাইন। এটি ঢাকার শব্দ গুচ্ছ প্রকাশনী থেকে ২০০৩ সালের ঢাকা বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ রাজা হর্ষবর্ধনের সময় এদেশে এসেছিলেন৷ ঘুরেছেন কাশ্মীর থেকে দাক্ষিণাত্য, পাঞ্জাব থেকে কপিলাবস্ত্ত৷ তাঁর কলমে ফুটে উঠেছে তদানীন্তন ভারতের রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক, আর্থিক এবং সামাজিক ইতিহাসের দলিল৷ 

বিভিন্ন ঐতিহাসিকরা মনে করেন, বৌদ্ধ শ্রমণরা সফর সূত্রে দুই দেশের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছিলেন সেই আদিকালেই। যার মধ্যে হিউয়েন সাঙ মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ভারত আর চীনের আদি সম্পর্ক সম্ভবত সেটাই৷ 

হিউয়েন সাঙ যেমন ভারতে এসেছিলেন, তেমনই এখানকার বিদ্বজ্জনরাও চিনে গিয়েছেন বারবার৷ এঁদের মারফতে চিনা ধর্মশাস্ত্রও ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতিতে যুক্ত হয়েছে বিভিন্নভাবে। তাহলে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় ভারত, চীনের এই চরম পর্যায়ের ইদানীংকালের দ্বন্দ্ব রাজা-বাদশাহের আমলের না। বরং, দু’দেশের মধ্যে সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটেছে বিভিন্নভাবে বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মসূত্রে। তাই, এই বৌদ্ধিক বিনিময় তাই আজকের নয় বহুদিনের৷ আর এক্ষেত্রে যিনি মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি বিখ্যাত পর্যটক, পরিব্রাজক ‘হিউয়েন সাঙ’।  আবার যার লেখনীর মাধ্যমে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা সম্পর্কে জানতে পেরেছে পুরো বিশ্ব।

তাইতো বিখ্যাত ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট আর্থার স্মিথ বলেছেন,

“হিউয়েন সাঙ এর কাছে ভারতের ইতিহাস যে কতখানি ঋণী তা নির্ণয় করা কঠিন”। 

লিখেছেনঃ যুবশ্রী ঘোষ