এক অচেনা-অন্যরকম ঈদের আবহে বাংলাদেশ

39

” ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন্‌ আসমানি তাগিদ।।”

ঈদ মানেই খুশি। ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে সবার সাথে মিলনমেলা। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা দেওয়া; নাড়ির টানে গ্রামে গিয়ে মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে একত্র হওয়া; নতুন জামাকাপড় পরা। 

৩০ দিন কঠোর নিয়মে সিয়াম সাধনার পর আনন্দ আর খুশির বার্তা নিয়ে ঈদ আসে।

আগামীকাল ২৫মে সোমবার, পবিত্র ঈদুল ফিতর।

ওপরে যে চারটি চরণ দিয়ে প্রবন্ধটি শুরু করলাম এটি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কালজয়ী গান। মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদ-উল-ফিতর নিয়ে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩১ সালে এই গানটি রচনা ও সুরারোপ করেন।

সেই তখন থেকে এখন অব্দি আমাদের বাঙ্গালি মুসলিম জীবনে এই গানটি অন্যরকম একটা জায়গা করে নিয়েছে। 

রমজান মাস শেষ, ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে এই গানটি শোনা চাই-ই-চাই।

শুনতেই হবে এরকম একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধুমাত্র,  বাঙালি মুসলিম জীবনে বলবো না, সকল বাঙালিদের মধ্যেই এই গানের সমান কদর রয়েছে। 

৩০ দিন সিয়াম সাধনার পর মুসলিম সম্প্রদায় কাল ঈদ উদযাপন করবে। 

শনিবার দেশের কোথাও পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে আগামীকাল সোমবার উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল ফিতর।

গতকাল সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা বসে। সেই সভা থেকেই জানানো হয়, শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের আকাশে কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে সোমবার।

ঈদ মানেই যেন ঘুম হারানো এক আনন্দের দিন। আর এই আনন্দের সূচনাটা হয় চাঁদ রাতের দিন থেকেই। ধনী-গরিব সবার মাঝেই আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। 

ভোরে উঠে বাড়ির ছেলেরা গোসল করে পরিছন্ন হয়ে নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে টুপি মাথায় দিয়ে, আতর মেখে, জায়নামাজ নিয়ে জামাতে যাবার রীতি রয়েছে।

 আর ঈদ মানেই ঈদ সেলামি।। এটা দিতে হবেই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের। এটা একটা আবদার।  

আর বাড়ির মেয়েরা ঈদের দিন ভোর রাত থেকেই লেগে পরেন বিভিন্ন রকমের খাবার বানাতে। নতুন জামা, নতুন কাপড়, খাবার-দাবার, আড্ডা, হৈ হুল্লোড় সব মিলিয়ে বিশাল আনন্দের আসর। প্রতিটি বাঙালি মুসলমান পরিবারই অপেক্ষায় থাকে কবে ঈদ আসবে, কবে আবার সবাই একত্রিত হবে।

তবে এবছর সব নিস্তব্ধ। করোনা ভাইরাস মহামারির থাবায় সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশও চুপ হয়ে গিয়েছে। তাইতো, এবছরের এই ঈদ আমাদের কাছে এক অজানা, অচেনা ঈদই বলা চলে। আমরা এতো শান্ত, এতো নিস্তব্ধ ঈদ আগে কখনোই দেখিনি। 

এবছর সাড়াশব্দহীনভাবে রমজান মাস এসেছিল, আর আজ ৩০ রোজা পার করে সাড়াশব্দহীনভাবেই এবছরের মতো চলে যাচ্ছে এই সিয়াম সাধনার মাস। 

রাত পোহালেই ঈদ।

কোথাও কারো মাঝেই খুশির জোয়ার নেই। এ মহামারির কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও থমকে গেছে।

আমরা খুঁজেই পাচ্ছি না আসলেই একি হচ্ছে? কবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে তারও উত্তর জানা নেই কারোর কাছে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ মরছে। গত দুই মাসে অনেকেই হারিয়েছেন তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশীসহ প্রিয়জনকে।

প্রিয়জন হারানোর ব্যথা এখনো মুছে যায়নি। 

নিজেদের সুরক্ষার জন্য সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে Stay Home শব্দ বসিয়ে আমরা অধিকাংশ মানুষই এখন ঘরবন্দি। আর আগামীকাল মহামারির এই ঘর বন্দি অবস্থা সাথে নিয়েই আমাদের ঈদ উদযাপন করতে হবে। যদিওবা সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার ঈদগাহের পরিবর্তে শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে ঈদের জামাত।

নামাজের আগে পুরো মসজিদ জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা; জায়নামাজ নিয়ে যাওয়া; অবশ্যই সবাইকে মাস্ক পরতে হবে; মসজিদে প্রবেশের আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। আর কোনভাবেই কোলাকুলি তো করা যাবেই না।

কিন্তু তবু দিনশেষে এক অজানা আতঙ্ক, আশঙ্কা, ভয় কি হবে পরবর্তী দিনগুলোতে, আমরা আবার প্রতিদিনের সেই সূর্যটাকে দেখতে পাবো তো, সবাই ভালো থাকবে তো এরকম হাজারো মন খারাপের শঙ্কা নিয়েই কাল আমাদের ঈদ উদযাপন করতে হচ্ছে। 

“এ এক অজানা-অন্যরকম ঈদ”।

প্রার্থনা শুধু,” মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা“। সব জরা, ব্যাধির অবসান হোক, শান্তি আসুক। মঙ্গলের বার্তা বয়ে যাক চারদিকে।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।।

লিখেছেনঃ ইভান পাল

ছবিঃ মহুয়া নওশিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here