“বিজয়া-দশমী”

46

নদীর ধারে কাশফুল, শিউলিফুলের চাদরে মোড়ানো শিশিরভেজা সবুজ ঘাস, মেঘমুক্ত শুভ্র নীল আকাশের সাথে মা দুর্গার আগমনী বার্তা নিয়ে প্রকৃতিতে আবির্ভাব ঘটে শরতের। বর্ষার কালো মেঘ সরিয়ে ওঠা ঝলমলে রোদের মতন আনন্দ ও খুশিতে মা দুর্গার আগমনী উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালীরা; মা কে সাদরে বরন করে নিতে করা হয় নানা আয়োজন। দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মায়ের আগমনে উৎসবমুখর আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে প্রতিটি সন্তানের হৃদয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও জাতি, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে আপামর বাঙালীর অংশগ্রহণে শারদীয় দুর্গোৎসব পরিণত হয় সার্বজনীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য দৃষ্টান্তে। আসুন তবে জেনে নেওয়া যাক বিজয়া দশমীর ইতিহাস, কিছু তাৎপর্য এবং দশমী নিয়ে কিছু কথা।

দুর্গাপূজার ইতিহাস: দুর্গাপূজার রয়েছে সুদীর্ঘকালের ইতিহাস। কবে,কখন,কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে  দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়েছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।হিন্দু পুরাণ মতে, ভগবান ব্রহ্মা মহিষাসুর দৈত্যের কিছু ভালো কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়ে বর দিতে চাইলে মহিষাসুর ‘অমর’ বর প্রার্থনা করেছিলেনন। ব্রহ্মা সরাসরি অমরত্ব বর না দিয়ে তাকে বর দিলেন, “বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো পুরুষের হাতে মহিষাসুরের মৃত্যু হবে না।” ভগবান ব্রহ্মা, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা- তাঁর কাছ থেকে এমন বর পেয়ে মহিষাসুর  ধরেই নিয়েছিল যেহেতু কোনো পুরুষের হাতে তার মৃত্যু নেই, তাই সে হবে অপরাজেয়, অমর-কেননা নারীরা শারীরিক দিক থেকে দুর্বল। স্বর্গ-মর্ত্য জয় করার উদ্দেশ্যে দেবতাদের ওপর অত্যাচার শুরু করল মহিষাসুর। তার অত্যাচারে স্বর্গের দেবতারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে মহিষাসুরের অত্যাচার দেবতাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। ধীরে ধীরে মহিষাসুর অপরাজেয় এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে; স্বর্গের দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়ন করতে শুরু করে।

অসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেবতারা অসুরকে বধ করার উপায় খুঁজতে থাকেন।ব্রহ্মা বর দেওয়ার সময় বলেছিলেন, কোনো পুরুষের হাতে মহিষাসুরের মৃত্যু হবে না কিন্তু নারীর হাতে মহিষাসুরের পরাস্ত হওয়ায় কোনো বাধা নেই। তখন ‘ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব’র আহ্বানে  দশভুজা নারী মূর্তির রূপে আবির্ভুত হলেন দেবী দুর্গা। মহাপরাক্রমশালী মহিষাসুরের সঙ্গে লড়তে হবে বলে দেবী দুর্গাকে দশ ভুজারূপে কল্পনা করা হয়েছে। দুর্গা আবির্ভূত হওয়ার পর দুর্গার দশ হাত মারণাস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করে দিলেন দেবতারা। শিব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, ইন্দ্র দিলেন তীর ধনুক, তরবারি, ঢাল, বিষধর সর্প, তীক্ষ্ম কাঁটাওয়ালা শঙ্খ, বিদ্যুৎবাহী বজ্র শক্তি এবং একটি পদ্মফুল।
দেবী দুর্গা এবং মহিষাসুরের মধ্যে দশ দিনব্যাপী মহাযুদ্ধ হয়েছিল।মহিষাসুর মায়ার খেলা জানত, দুর্গাকে বিভ্রান্ত করতে সে একেকবার একেক জন্তু-জানোয়ারের রূপ ধারণ করছিল বিধায় মহিশাসুরকে পরাস্ত করা রীতিমতো অসাধ্য হয়ে উঠছিল।মহিষাঅসুরের ক্ষতস্থান থেকে রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়া মাত্র সেখান থেকে একই চেহারার আরেকটি অসুর জন্ম নিচ্ছিল। এভাবে দুর্গার তরবারির কোপে রক্তাক্ত অসুরের প্রতি রক্তবিন্দু থেকে শত সহস্র অসুরের জন্ম হলো এবং দুর্গাকে বধ করতে উদ্যত হল। তখনই দেবী দুর্গা অন্য মূর্তি ধারণ করলেন।সে মূর্তির রূপ হলো আরও ভয়ঙ্কর, লম্বা জিভ, চার হস্ত কালী মূর্তি, যার প্রধান কাজই ছিল অসুরের রক্তবীজ মাটি স্পর্শ করার আগেই লম্বা জিভ বের করে চেটে খেয়ে ফেলা। এভাবেই রক্তবীজ থেকে অসুরের উৎপত্তি বন্ধ হয়ে গেল।যুদ্ধের দশম দিনে অসুর মহিষের রূপ নিয়েছিল। উপায়ান্তর না দেখে অসুর মহিষের দেহ থেকে বেরিয়ে এলো বিশালদেহী মানুষের রূপে, তখনই দেবী দুর্গার হাতের ত্রিশূল মহিষাসুরের বক্ষ্যভেদ করল। মহিষাসুরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালে শান্তি ফিরে এলো।দেবতা ইন্দ্র ফিরে পেলেন তারর স্বর্গরাজ্য।এ বিজয়োৎসবই বিজয়া নামে পরিচিত।

দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাংলা আশ্বিন মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)। শরৎকালে পূজা অনুষ্ঠিত হয় বলে দুর্গাপূজাকে ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’ বলা হয়। মূল দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল বসন্তকালে, সেই পূজার আরেক নাম ‘বাসন্তী পূজা’। হিন্দু পুরাণ মতে, শরৎকালীন দুর্গাপূজার প্রচলন হয় রামায়ণ যুগ থেকে। রাক্ষসরাজ রাবণ শ্রীরামের স্ত্রী সীতাদেবীকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে গেছিল, রাজা রাম স্ত্রী সীতাকে রাক্ষসরাজ রাবণের বন্দীশালা থেকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে ‘দেবী চণ্ডি’রূপী দুর্গার পূজা করেছিলেন। ১০৮টি নীলপদ্ম এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে পূজা করেছিলেন। (রামায়ণে বর্ণিত আছে, ১০৭টি পদ্ম জোগাড় হয়েছিল, শ্রীরাম ছিলেন ‘নীলনয়ন’, উপায়ান্তর না দেখে শ্রীরাম নিজের একখানি চোখ দান করতে উদ্যত হয়েছিলেন, শ্রীরামের ভক্তিতে দেবী দুর্গা সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং শ্রীরামকে চোখ দান করা থেকে নিবৃত্ত করেন।) বসন্তকালের পরিবর্তে শরৎকালে দুর্গাপূজা করেছিল বলেই এ পূজাকে ‘অকাল’বোধন বলা হয়।

শারদীয় দুর্গা উৎসব

বাঙালীর শারোদৎসব: সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “মহাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি প্রচলিত আছে।

বিজয়া দশমী: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রচিত সঙ্গীতে বলেছেন-


          “যদি হল যাবার ক্ষণ,
তবে যাও দিয়ে যাও শেষের পরশন।
বারেবারে যেথায় আপন গানে স্বপন ভাসাই দূরের পানে
মাঝে মাঝে দেখে যেও শূণ্য বাতায়ন-
            সে মোর শূণ্য বাতায়ন।।”

“দশমী” কথাটির প্রাসঙ্গিক তাৎপর্য সহজবোধ্য। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে দেবী কৈলাস পাড়ি দেন। সেই কারণেই ‘বিজয়া দশমী’ নাম। কিন্তু এই দশমীকে ‘বিজয়া’ বলা হয় কেন, তার পৌরাণিক ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে একাধিক কাহিনি সামনে আসে।

পুরাণ মতে, মহিষাসুরের সঙ্গে ৯ দিন ও ৯ রাত্রি যুদ্ধ করার পর দশম দিনে জয় লাভ করেন দেবী দুর্গা। সেই জয়কেই চিহ্নিত করে বিজয়া দশমী। তবে উত্তর ও মধ্য ভারতে এই দিনে যে দশেরা উদযাপিত হয়, তার তাৎপর্য ভিন্ন। বাল্মীকি রচিত রামায়ণে কথিত আছে, আশ্বিন মাসের শুক্লা পক্ষের দশমী তিথিতেই নাকি রাবনকে বধ করেছিলেন শ্রী রামচন্দ্র। তাই এই দিনটিকে দশেরা বা দশহরা হিসেবে পালন করেন উত্তর ও মধ্য ভারতের মানুষ।
আবার কালিদাসের রঘুবংশ ও তুলসিদাসের রামচরিতমানসে বলা হয়েছে যে আশ্বিনের তিরিশতম দিনে লঙ্কা জয় করে সস্ত্রীক অযোধ্যায় ফিরেছিলেন শ্রী রামচন্দ্র। সেই প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঘরে ঘরে জ্বলেছিল দীপ। সেই রীতিই দশেরা ও দীপাবলি রূপে পালন করা হয়।

দর্শন মতে, দেবী দুর্গার বিদায়ের দিনে বিষাদের সুরেই বিজয়া দশমী পালন করে মর্ত্যবাসী। সধবা মহিলারা সিঁদূর খেলায় মেতে ওঠেন। আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয় মানবকুল। চলে মিষ্টিমুখ। বিশ্ব সংসারে ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। আর এখানেই বিজয়া দশমীর বিশেষত্ব অন্যরকম বলে মনে করা। তবে দুর্গাপুজোর শেষ দিন হিসাবে দশমী শোকের ছায়া বহন করলেও শাস্ত্রে এই বিষয়টিকে সেই ভাবে দেখা হয়নি। এপ্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের একটি কাহিনী উল্লেখযোগ্য। রানী রাসমণীর জামাতা মথুরবাবু একসময় আবেগপ্রবন হয়ে দশমীর দিনেও মা দুর্গাকে বিসর্জন দেবেন না বলে জেদ ধরে বসেন। তখন রামকৃষ্ণদেব তাঁকে বোঝান, বিজয়ার অর্থ দেবীমা ও সন্তানের বিচ্ছেদ নয়। তিনি আরও বলেন যে, মা কখনও তার সন্তানের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন না। এতদিন মা দালানে বসে পুজো নিয়েছেন এরপর মা হৃদয়মন্দিরে বসে পুজো নেবেন। এরপরেই মথুর শান্ত হন এবং বিসর্জন হয় মা দুর্গার প্রতিমা

বিজয়া দশমীর তাৎপর্য: বিজয়া দশমীর তাৎপর্য  দুটি। একটি দেবী দুর্গার বিজয়, অপরটি শ্রী রামচন্দ্রের বিজয়। রামচন্দ্র অকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার বর্ণনা বাল্মীকির রামায়ণে নেই। তবে অন্য কবিদের রচিত রামায়ণে এবং পুরাণে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার বর্ণনা রয়েছে। দেবীর নিদ্রাকালে রাম তাকে জাগ্রত করেছিলেন বলে শরৎকালের দুর্গাপূজায় ‘বোধন’ নামক দেবীর জাগরণের একটি অনুষ্ঠান করা হয়। কিন্তু বসন্তকালের দুর্গাপূজায় এ বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। তবে কেবল রামচন্দ্রই যে শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন তা নয়, শরৎকালে দুর্গাপূজার রীতি অনেক স্থানেই প্রচলিত ছিল।

বিজয়া দশমীর আরও একটি তাৎপর্য রয়েছে। হিমালয় রাজকন্যা দেবী দুর্গা বা পার্বতী বা উমা নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছিলেন দেবতা শিবকে। শিবের আবাসস্থল কৈলাস পর্বত। সেখান থেকে দেবী দুর্গা বা পার্বতী পিতৃগৃহে আসেন। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিন দিন পিতৃলয়ে থাকার পর দশমী তিথিতে পতিগৃহ কৈলাসে প্রত্যাবর্তন করেন। কন্যাকে বিদায় জানানোর বেদনায় বিধুর হয়, বিষাদাচ্ছন্ন হয় দশমী তিথি। তাই দশমী তিথি বিষাদের, বেদনার।
বাঙালি হিন্দুবাড়িতে বিবাহিত কন্যারাও বিদায় নিয়ে স্বামীগৃহে চলে যান। এ ক্ষেত্রে দেবী দুর্গার বিদায় বেদনা ও কন্যার বিদায় বেদনা এক হয়ে যায়। বাঙালি হিন্দুরা মনে করেন, বিজয়া দশমীতে তারা কেবল দেবী দুর্গাকে বিদায় দিচ্ছেন না, যেন নিজের কন্যাকে বিদায় দিচ্ছেন। দেবী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে যে নাইওরে এসে, তিন দিন থেকে চার দিনের দিন স্বামীগৃহে ফিরে যান। এভাবে পূজাপার্বণের মধ্যে বাঙালির সমাজ ও যাপিত জীবনের প্রতিফলনও ঘটে। বিজয়া দশমী এমনই একটি ধর্মীয় কৃত্য, যার মধ্য দিয়ে সমাজ জীবনের একটি দিকের প্রতিচ্ছায়া উপলব্ধি করা যায়।

দেবী দুর্গা তো অমর। তাহলে দেবীর বিসর্জন কি করে হয়?হিন্দু শাস্ত্র মতে, দেবীকে পূজার জন্য আহ্বান করে  মাটির প্রতিমাতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পূজা শেষ হলে দেবীকে বলা হয়, তুমি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারো। তখন প্রতিমা থেকে তাকে মুক্ত করা হয়। তখন ওই মাটির প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। সুতরাং বিসর্জন নামে দেবী বা কোনো দেবের ধ্বংস নয়, যে মাটির প্রতিমাতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, সেখান থেকে মুক্ত করে, তাকে যথা ইচ্ছা চলে যেতে বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিসর্জন দেওয়া হয় না। দেব বা দেবীর প্রতিমা গৃহেই থাকে। বছরান্তে পুরাতন প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে নতুন প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। কাঠের প্রতিমা হলেও তা নির্দিষ্ট সময়ের পর পরিবর্তন করা হয়। ধাতব কিংবা প্রস্তরের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় না। সেই স্থলে নিত্য পূজা করা হয়।

“ধর্ম যার যার,উৎসব সবার”-এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী বাঙালীরা প্রতিবছর দুর্গাপূজার সময়ে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে উৎসব আনন্দে মেতে ওঠে।নতুন পোশাক পরে প্রিয়জন ও পরিবারের সাথে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ঠাকুর দেখা, হৈ চৈ-উল্লাস আর নানরকম মুখোরোচক খাবারের স্বাদে কেটে যায় দশটি দিন। বিজয়া দশমীতে চোখের জলে মা কে বিদায় দিয়ে পরবর্তী বছরে মায়ের আগমনের প্রতীক্ষায় থাকে গোটা বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার চতুর্দশপদী কবিতায় বিজয়া দশমীর বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
       “যেয়ো না,রজনি,আজি লয়ে তারাদলে!
        গেলে তুমি,দয়াময়ি,এ পরাণ যাবে!
        উদিলে নির্দ্দয় রবি উদয়-অচলে,
       নয়নের মনি মোর নয়ন হারাবে!
       বারো মাস তিতি,সত্যি,নিত্য অশ্রুজলে,
       পেয়েছি উমায় আমি!কি সান্ত্বনা-ভাবে—
       তিনটি দিনেতে, কহ,লো তারা কুন্তলে,
      এ দীর্ঘ বিরহ-জ্বালা, এ মন জুড়াবে?
      তিন দিন স্বর্ণদ্বীপ জ্বলিতেছে ঘরে
      দূর করে অন্ধকার, শুনিতেছি বাণী—
      মিষ্টতম এ সৃষ্টিতে এ কর্ণ-কুহরে!
      দ্বিহুন আঁধার ঘর হবে, আমি জানি,
      নিবাও এ দ্বীপ যদি!”—কহিলা কাতরে
      নবমীর নিশা শেষে গিরীশের রাণী।

লেখাঃ আফিয়া তাসনিম।