একজন কথাসাহিত্যিক তকিব তৌফিক

227

মোস্তফা কামাল পাশা এবং জোছনা আকতারের চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র সন্তান হলেন তকিব তৌফিক। চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার অধীনে লেলাং গ্রামে জন্ম। ‘মঈনউদ্দিন মিয়াজির বাড়ি’র মধ্যে তকিব তৌফিকের বেড়ে উঠা, নিজের সাধের বাড়িটির নাম দিয়েছেন ‘অলকানন্দা’। বাড়ির পাশেই অলকানন্দা ফুলের গাছ। আছে মৌ-সন্ধ্যা সহ বাহারি জাতের নানান গাছ, তকিব তৌফিকের ভীষণ প্রিয়।

ছোট্ট তকিব তৌফিকের লেখাপড়ার হাতেখড়ি হবার পর ভর্তি হয় গুলতাজ মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ-এ। স্কুল এবং কলেজ জীবন সেখান থেকেই পার করেন তিনি। স্কুলে পড়াশোনায় বড্ড মনোযোগী ছিলেন এই লেখক। তকিব তৌফিকের স্কুল জীবনের মজার কোনো স্মৃতি জানার জন্যে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, “শীতের সন্ধ্যায়, আবছা আঁধারে দূরে একটা পরী।
সেই পরী পাখা মেলে আমার দিকেই আসছে। আমার দিকে তার গন্তব্য দেখে ভয়ে আমার পা কাঁপে, পথ ফুরোয় না। আমি দ্রুত পা ফেলি, পথ যেনো আরও দীর্ঘ হয়। পরীটা ক্রমশ কাছেই আসছে।
সেদিন স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হয়েছিল, বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম।

যাইহোক, পরীটা আসছে, আমার দিকেই আসছে।
নিঃশ্বাসের যখন বেহাল দশা, নিউরন যখন বলছে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো তখনই আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। ওটা পরী নয়, ওটা ছিল তরকারিওয়ালা। তরকারিওয়ালার হেটে আসা দেখে শঙ্কিত হয়েছিলাম। সাদা বস্তার দুই খাঁচা ভার করে সে আমার দিকে এগিয়ে আসছিল। দ্রুত পা ফেলায় সেই খাঁচা দুলছিল। আবছা অন্ধকার, শীত সন্ধ্যার কোয়াশায় তা স্পষ্ট ছিল না।
আর আমি পরীর পাখা এবং তরকারিওয়ালার ভার করা খাঁচার মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলাম।

এছাড়া শৈশবের অজস্র স্মৃতিই জীবনে জড়িয়ে তবে তার মধ্যে একটি স্মৃতি আমার এবং আমাকে যারা দেখে তাদের সকলের কাছে স্পষ্ট। সেটা হলো আমার দাঁতের দাগ। সেটা একটা মজার স্মৃতি।
প্রিয় লাটিমটি কেড়ে নেয় চাচ্চু। নাম তার জামশেদ বাবলু। বয়স আমার থেকে খুব একটা ফারাক ছিল না, তাই খেলাধুলা হত।
তো খেলা জমে গেল। খেলতে খেলতে দুজনই পুকুর ঘাটে মশুগুল।
এক পর্যায়ে আমার লাটিম ঘুরে বেশিক্ষণ বাবলু চাচুরটা থেমে যাচ্ছিল আমার লাটিমের আগেই। এক পর্যায়ে সে ক্ষুব্ধ হয়ে লাটিম বেশি ঘুরাবে বলে জোরে তা ছুড়ে মারে। লাটিম এবার মাটি ছোঁয়নি। ছোঁয়েছে আমার দাঁত। ব্যাস! সেই থেকে ফাটা দাঁতের কলঙ্ক। তারপর বড় হচ্ছিলাম সময়ের সাথে সাথে। এলাকার অনেকেই দুষ্টমি করতো, ‘তকিব তুই তো বউ পাবি না, দাঁত ভাঙা।’
আমার সেকী চিন্তা! নিজের জন্য নয়। মায়ের জন্য। মা প্রায় বলতো, ‘আমার একটাই ছেলে একটাই রাজপুত্র, তার জন্য লাল টুকটুকে বউ আনবো’। আমিও তখন লাল টুকটুকে, কালো কুচকুচে, সাদা ধবধবে কী তা বুঝি না। আমি মায়ের অভিলাষ বুঝি। মায়ের অভিলাষ ভাঙনের দুশ্চিন্তা মাথায় ঢুকে। সে থেকে দাঁতের চিকিৎসার জন্য ব্যস্ত হয়ে যাই কারণ লাল টুকটুকে বউ আমার লাগবেই। কিন্তু দাঁত ঠিক না হলে বউ’ই তো পাবো না আমি! চিন্তা বেড়েই গেল। চিকিৎসা করাতে পারবো কিন্তু অত টাকা আমার কাছে নেই। বয়স কম, অত টাকা আমার ঈদের জমে শুধু। তাও মাকে দিয়ে দিতাম।
শেষমেশ মাকে বলতে বাধ্য হলাম আমার টাকা চাই। টাকার পরিমাণ শুনে মা অবাক হলেন না। কিন্তু ভুরো কুঁচকালেন। তার মানে মায়ের সন্দেহ হল। মায়ের সন্দেহ মানে আমার ছটফট। তাই আর দেরি না করে আমি মাকে সব খুলে বললাম। মা তো হাসতে হাসতে শেষ। তারপর মা হাসি থামিয়ে বলেন, ‘ওরে আমার ছেলে! তোমার দাঁতের এই দাগ তোমার চেহারার মায়া হোক। এই দাগে হাসির সৌন্দর্য্য বাড়ুক, কেউ না জানুক কেউ না জানুক’।
মায়ের দু’আ কবুল হল। মায়ের কথা’ই ঠিক হল। এখন সেটা প্রতিনিয়ত প্রমাণ পাই। “

লেখক তকিব তৌফিক, ছবি: সংগৃহীত।

লেখালেখির শুরুটা ঠিক কবে সেটি জানতে চাওয়া হলে লেখক বলেন, “কবে, কীভাবে লেখা শুরু করবো তা কখনো ভাবিনি। পড়তাম বেশ। সে থেকে স্পৃহা। ডায়েরি লেখার অভ্যাস আছে। তা থেকেই হয়তো অভ্যাসটা পরিসরে বড় রূপে রুপান্তরিত। এটুকুই।”

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন এবং সরকারি কমার্স কলেজ, চট্টগ্রামে লেখকের স্নাতকোত্তর পড়ক হয়। ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর করেছেন তকিব তৌফিক। নিজেকে খুব একটা ভালো ছাত্র দাবি না করলেও তিনি যে বড্ড পরিশ্রমী ছিলেন এই কথা যেন কারোর অজানা নয়। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর থেকেই চাকরী জীবনের সাথে পরিচয় ঘটেছে। নানান কাজে নিজেকে নিযুক্ত করেছেন।

চট্টগ্রামের প্যারড কর্নারের ফুটপাত হয়ে কাজির দেউড়ির ফুটপাত জানে লেখক তকিব তৌফিক ফর্মাল পোশাকে মজুর খাটতে কতটা পথ হেঁটেছেন। বেলা ১১ টার পেয়াজু জানে পান্তা ভাতের সাথে তার সম্পর্ক কী! এসব অজস্র কথা গল্প নিয়েই তকিব তৌফিকের জীবনের অধ্যায়। তবে ভালো দিন তার জীবনে ঘেঁষেছিল দ্রুতই। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ইপিজেড-এ চিটাগাং ফ্যাশন গ্রুপে ওয়েব ডিজাইনার হিসেবে ৩ মাসের জন্য নিয়োগ পান তকিব তৌফিক।

লেখক নিজে থেকেই বলতে থাকেন, ” কাজ করতে থাকি আর পরিস্থিতি বুঝবার চেষ্টা করি। যা বুঝলাম আর এম জি সেক্টরে আইটির কাজটা জরুরী হলেও প্রাধান্য কম। মাস খানেক গেলে দেখি আমার আর তেমন কাজ নেই। এই মেইলে সমস্যা হল কিনা, কেবল সরে গেল, এটা সেটা। কিন্তু পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকতো। ম্যানেজার স্যারের অনুমতি নিয়ে আমি কারখানা ঘুরে দেখা শুরু করলাম। পূর্ব পরিচিত শব্দ এইচ আর ডিপার্টমেন্টের কাজগুলো বুঝতে শুরু করি। এক পর্যায়ে নতুন এক শব্দের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। কমপ্লাইন্স! “

লেখকের পুরো কৌতুহল শুরু হয় এই শব্দকে ঘিরে। তারপর সাহস করে নিজেই জেনারেল ম্যানেজার স্যারের সাথে কথা বলে এই সেক্টরে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং নিযুক্ত হয়ে যান নতুন কাজে। লেখক তকিব তৌফিকের কাছ থেকে আরও যদি একটু শুনে আসা যায়, ” অল্প বেতনে কমপ্লাইন্সের ট্রেনি হিসেবে একই প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত হই। তারপর দেখি আর এম জি সমগ্রে বিশাল এক অধ্যায়ের নাম হল ‘কমপ্লাইন্স’। আগ্রহ থাকায় কাজটাও হচ্ছিল বেশ উপভোগ্য। সেই থেকে কর্পোরেট চাকরীতে আমার যাত্রা। দুইবছর যাবত কমপ্লাইন্সে কাজ করে পদন্নোতি এবং বেতন বৃদ্ধির মধ্যে দিয়েও আমি চাকরীটি করে যেতে পারিনি। কারণ তখন আমার পড়াশোনার প্রচন্ড চাপ পড়ে যায়। সেই সুবাদে প্রায় দুইবছর চাকরি না করে ছোট পরিসরে ব্যবসা আর পড়াশোনা করি। “

পাঠকপ্রিয় লেখক তকিব তৌফিক।

২০১৯ সালে লেখক নিযুক্ত হন “ইউনাইটেড ন্যাশনস হাই কমিশনার ফর রিফুজিস”-এ। সুখ, দুঃখ, অভিলাষ অনুভুতি আর হাজার জীবনের গল্পের মাঝে যেনো বসবাস শুরু হয় তকিব তৌফিকের। এ যেন এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা! লেখকের ত্রয়ী উপন্যাস ‘নিদাস্তিয়া’র প্রথম খন্ড সেখান থেকেই লেখা। সেখান থেকেই রচনা করেছেন ‘আমি শরনার্থী শিবির থেকে বলছি’ কবিতার মতো পাঠকপ্রিয় কবিতা।

তকিব তৌফিকের প্রকাশিত পাঁচটি গ্রন্থের মধ্যে চারটিই প্রকাশিত হয়েছে নালন্দা প্রকাশনী থেকে। ‘এপিলেপটিক হায়দার’ দিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর একে একে এসেছে ‘কাঙালের সংলাপ’, ‘অধ্যায়’, ‘নিদাস্তিয়া’ এবং সর্বশেষ এসেছে কাব্যগ্রন্থ ‘ক্যাকটাস’, পুস্তক প্রকাশন থেকে। উপন্যাসিক হিসেবে বেশ নাম কুড়িয়েছেন এই লেখক। তবে শেষবেলায় এসে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ এবং অবিস্মরণীয় সাড়া ফেলে দেয়ার মাধ্যমে পরিচিত হয়েছেন কবি হিসেবে। প্রশংসা কুড়িয়েছেন অনেক বেশি।

কথাসাহিত্যিক তকিব তৌফিক। ছবি: সংগৃহীত

লেখক হিসেবে, লেখার মানের দিক থেকে তকিব তৌফিক যতোটা ভালো, তার চাইতে ভালো হলেন মনের দিক থেকে। মাটির মানুষ তকিব তৌফিক। ভীষণ বিনয়ী মানুষ। বেশ আন্তরিক।

আগামীবছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ সালে প্রকাশিত হবে তকিব তৌফিকের নতুন উপন্যাস ‘রিঙ্গণপুর’।

বর্তমানে তকিব তৌফিক ডেলমাস অ্যাপারেলস (প্রাঃ) লিমিটেড-এ ‘ব্যবস্থাপক (কমপ্লাইস)’ হিসেবে যুক্ত আছেন।

কথাসাহিত্যিক তকিব তৌফিক। ছবি : সংগৃহীত