মাসুদ আনসারী
মোটিভেশনাল স্পিচকে গালি দিয়েও লাভ নেই। আমরা সামান্য কিছুতেই বেশি হতাশায় ভুগি। আমাদের ধৈর্য নেই। আমাদের সমাজ- পরিবারে এ+ না পেলে মুখ দেখানো যায় না। অভিভাবকরা গালি দিতে কার্পণ্য করে না। গায়ে বেমালুম মার বসে। চারদিক থেকে শুধু বেসামাল অস্থিরতা ভর করে। মেয়েদের খারাপ রেজাল্ট হলে বিয়ে দিয়ে দেয়ার হুমকি আসে। ‘আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না’ অনেকেই এই বিশ্বাসে গুরুতর বিশ্বস্ত হয়ে যায়। এইজন্য নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নও সবাই দেখতে পারে না। কেউ পড়ালেখার ইতি টানে কিংবা অপরাধে পা বাড়ায়। অনেকে আবার বেছে নেয় জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত আত্নহত্যা। আত্নহত্যা করা শিক্ষার্থীটির ভেতরে কতো মহামূল্যবান প্রতিভা লুকিয়ে ছিল, সেটা হয়তো আমাদের জানা নেই!
আপনার একটা মোটিভেট স্পিচ হয়তো আজকে এ+ না পেয়ে বা ফেল করা শিক্ষার্থীর ভেতরে নতুন করে আশার সঞ্চার করাতে পারে। স্বপ্নও দেখাতে পারে। আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না এই গুরুতর বিশ্বাস কে তারা অবিশ্বাস করতে শিখে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্লান আঁকে। ‘না আমাকে পারতেই হবে’ এই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যায়। তারা বুঝতে শিখে… আমার কাছ থেকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অনেক কিছুই প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা কে কোনোভাবেই নিস্তেজ করা যাবে না।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও খুব সুবিধার নয়। নতুন নতুন নিয়ম করে আমাদের বিপদে ফেলে দেয়া হয়। জগতের বিশাল এক ভয়ংকর আতংক মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অদ্ভুত একটা শক্তি আছে!
আমাদের দেশে প্রশ্ন ফাঁসের ছড়াছড়ি। সারাবছর না পড়েও অনেকেই গোল্ডেন পেয়ে যায়। আবার অনেকেই ভালভাবে সারাবছর পড়াশুনা করেও প্রত্যাশিত রেজাল্ট বা এ+ পায় না। তাহলে তার দু:খ কিংবা হতাশার পরিমাণ কি রকম হতে পারে একটু ভেবে দেখেছেন? সেও হয়তো অপ্রত্যাশিত একটা পথ বেছে নিতেই পারে। তাদেরকে এই পথ থেকে ফিরে আনার জন্যই মোটিভেশন স্পিচ খুব জরুরী। যে ছেলেটা ফেল করেছে তাকেও আগামীতে ভালো রেজাল্টের স্বপ্নের সূত্র মাথায় ঢুকিয়ে দিতে আপনার মোটিভেশন খুব দরকার। মোটিভেশনের স্পিচ যদি হয় আপনার জীবনের গল্প, তাহলে সেটা বারবার বলুন। আমাদের স্বপ্ন দেখান, আমরা স্বপ্ন দেখতে চাই।
অনেকেই আবার ভালো পরীক্ষা দিয়েও প্রত্যাশিত রেজাল্ট পায় না। তাদের কাগজ সে ভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। আমাদের দেশের শিক্ষকরা খুব বেশি সৌখিন এবং পেশাদারিত্ব হারিয়ে ফেলছে। তারা খাতা মূল্যায়নে খুব বেশি সচেতন থাকেন না। মন গড়া মার্কস বসিয়ে দেন! জ্বলন্ত প্রমাণ আছে এগুলোর!!
আমাদের দেশে রেজাল্টেও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ চলে। নির্বাচনের আগের এবং পরের ইয়ারের শিক্ষার্থীদের কপালে হয়তো একদম সুখকর রেজাল্ট থাকে কিংবা ভাবনার চেয়েও খারাপ রেজাল্ট অপেক্ষা করে। চরম অনিশ্চয়তা! অনেকের আবার রেজাল্ট পরবর্তী বক্তব্যে সাফল্যের হিড়িক তুলার জন্য রেজাল্টেও প্রভাব আসে। দুইটা সিম্পল উদাহরণ দিলাম! ছোট থেকে দেখে আসছি, বড়দের কাছ থেকেও শুনেছি। তবে অবশ্য গত কয়েকবছর এগুলা দেখা যাচ্ছে না! তারমানে নতুন বাংলাদেশ আমরা দেখতে পারছি। চাই এভাবেই চলুক।
আমরা পরীক্ষার খাতায় নিজের মেধা বিচরণ করিয়ে দেয়ার পর্যাপ্ত সময় পাই না। তাই আমাদের মুখস্থ বিদ্যা খাতায় উগলিয়ে দিতে হয়। মুখস্থ বিদ্যায় বারবার শরণাপন্ন হতে হয় আমাদের।
সাতটি সৃজনশীল লেখার কষ্ট আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বুঝতে পারছে না। আমাদের এইসব কচি হাতের করুণ চিৎকার শিক্ষাব্যবস্থার কানে ঢুকছে না! নিজের সৃজনশীলতাকে খাতায় প্রয়োগ করতে না পারার ব্যথা শিক্ষাব্যবস্থা অনুধাবন করতে পারছে না। আমাদের পরীক্ষার রাতগুলোতে টেনশনে বালিশ ভেজানোর কষ্ট কে বা বুঝতে পারে!
আমাদের দেশে পরীক্ষার জন্য আন্দোলন করলে আমাদের চোখ অন্ধ করে দেয়া হয়। এই সুন্দর বাংলাদেশ দেখার অধিকার আমাদের থেকে কেড়ে নেয়া হয়! ‘ পরীক্ষার জন্য আন্দোলন করে’ তাহলে ভেবে দেখুন আমাদের পড়াশুনার প্রতি কতো আগ্রহ! পরীক্ষার জন্য আন্দোলন করে চোখ হারানোর ইতিহাস পৃথিবীতে আর একটাও আছে কিনা আমি জানি না। ভিন্ন কোনো অহেতুক ইস্যুতে আমাদের আন্দোলন হয় না। পরীক্ষার জন্য হয়, ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য হয় কিংবা অতিরিক্ত চাপ ঘাঁড় থেকে সরানোর জন্য হয়। আমাদের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মেধা কত স্বচ্ছ একটু ভাবুন তো?