অন্তঃসত্ত্বা হাতি হত্যা ও আমাদের আবেগ

92

নাহিদ আহসান ||

ভারতের কেরালায় অন্তঃসত্ত্বা হাতি হত্যায় বিচারের দাবীতে অনলাইন পিটিশনে লাখো মানুষ সই করেছে অথচ গত মে মাসে মাদারীপুরে খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে ১৬টি বানরকে হত্যার দাবীতে আমরা কেউ কিছুই বলিনি। কিছুদিন আগে হালদায় ডলফিন হত্যা করা হয় নৃশংসভাবে, আমরা অনেকে সে খবর জানিই না। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সামলাপুরে পড়ে থাকতে দেখা যায় ডলফিনের মৃতদেহ, অনলাইন পিটিশন করিনি কেউই। আমাদের আবেগগুলো সচরাচর এভাবেই বদলাতে দেখা যায় এবং আমরা বিশাল একটা জনগোষ্ঠী যারা গত তিনদিন যাবত অনলাইনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই হাতি হত্যার বিরূদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছি, তারা যে অনেকেই এর সঠিক খবরটাও জানি না, সে বিষয়েও কিন্তু খুব একটা সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ নেই। আসলে আমরা কেন একটা বিষয় খুব দ্রুত যাচাই বাছাই ছাড়া বিচার করি বা কেনই একটা বিষয়ে হঠাৎ করে আমাদের আবেগ জেগে উঠে সে বিষয় নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের যে আরও কাজ করতে হবে, সে বিষয়েও সন্দেহের অবকাশ নেই।

গত ২৭ মে বিকেল ৪ টায় কেরালার স্থানীয় ভেলিয়ার নদীতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মারা যায় অন্তঃসত্ত্বা এক হাতি। আপনি এবং আমরা হয়ত এই খবর গত দুইদিন আগে পেয়েছি এবং সমানতালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় তুলেছি। দ্যা ডেইলি স্টার বাংলার এক প্রতিবেদনে জানা যায় ভারতের উত্তর কেরালার মালাপ্পুরমের বন বিভাগের কর্মকর্তা মোহন কৃষ্ণন ঘটনাটি ফেসবুকে এভাবে বর্ণনা করেন, ” ও (হাতিটি) সবাইকে বিশ্বাস করেছিল। আনারসটি খাওয়ার পরে যখন তার মুখের ভেতর সেটার বিস্ফোরণ হলো তখন ও নিশ্চয়ই শিউরে উঠেছিল। বিস্ফোরণটি এত ব্যাপক ছিল যে, হাতিটির জিভ ও মুখ ভয়ঙ্করভাবে আঘাত পায়। যন্ত্রণায় হাতিটি গ্রামের পথে ছুটতে থাকে। এই চরম যন্ত্রণার মধ্যেও সে কোনো বাড়ি ভাঙেনি, কারো ক্ষতি করেনি।
মুখের ভেতর বারুদের বিস্ফোরণ হওয়ার পর পানিতে ছুটে যায় ওই হাতি। যন্ত্রণার উপশম পেতে হাতিটি স্থানীয় ভেলিয়ার নদীর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝ নদীতে দাঁড়িয়ে থেকেই একসময় মারা যায়।”

আমরা অনেকেই বা প্রায় সবাই খবরটা জানি। এক অন্তঃসত্ত্বা হাতি দলছুট হয়ে লোকালয়ে ঢুকে যায় এরপর স্থানীয় মানুষ সেই হাতিটিকে আনারস খাইতে দেয় যেই আনারসের ভেতর ছিলো বারুদ। খাওয়ারপরেই মুখের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটে এবং প্রচন্ডভাবে জখম হয় হাতির মুখ এবং মুখের ভেতরের চোয়াল। এরপরই তা যন্ত্রণা লাঘব করতে পাশের ভেলিয়ার নদীতে চলে গিয়ে মুখ ডুবিয়ে রাখে। এই খবরটিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় করে চাউর হয় এবং নিন্দার ঝড় শুরু হয়।

আইবি টাইমসকে বন কর্মকর্তা ড. এ বি কাইয়ুম এই বিষয়ে মতামত জানাতে গিয়ে বলেন, স্থানীয় লোকেরা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হাতিটিকে আনারস খাওয়ায়নি বরং কোথাও পড়ে থাকা এই ফাঁদপাতা আনারসটিই হাতি খেয়েছে।

এখন এতকিছু জানার পরে প্রশ্ন উঠবেই কোন খবর সঠিক আর কোনটা সঠিক নয়। এবার চলুন আবেগ বাদ দিয়ে বিবেকের দিকে একটু পা বাড়াই। স্থানীয় লোকেরা বুনো পশুদের হাত থেকে নিজেদের ফসল এবং প্রাণ রক্ষা করতে বিশ্বের সবখানেই (যেসব অঞ্চলে বুনো পশুদের লোকালয়ে আনাগোনা বেশি) আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। নিজেদের ফসল রক্ষা করতে বুনো শূয়র থেকে শুরু করে অন্যান্য পশুদের জন্যেও বেশ কিছু ফাঁদ স্থানীয় মানুষেরা পেতে থাকে। পশু শিকার করতে বা নৃশংসভাবে পশু হত্যা করতে এই কাজটি করা হয়না। পাহাড়ি অঞ্চল বা অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে হাতিদের আনাগোনা বেশি, সেসব জায়গায় হাতিকর্তৃক মানুষ হত্যার খবরগুলো যে প্রতিনিয়ত কানে আসে সে বিষয়েও হয়ত সকলে অবগত নই। বুনো পশুরা হেক্টরের পর হেক্টর আবাদি জমি কিভাবে নষ্ট করে দিয়ে যায় সেসব খবরও কিন্তু অজানা নয়। যেসব অঞ্চলে এইসব ঘটনা ঘটে সেসব অঞ্চলের মানুষেরা খুব বেশি শিক্ষিতও না যে তারা অন্য কোন উপায় আবিষ্কার করবে যাতে পশুর কোন ক্ষতি না হয়। ঠিক এইরকমই একটা কারণে কেরালার সেই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারা বুনো শূয়রদের ভয় দেখাতে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছিলো কিন্তু দলছুট এই হাতিটি এসে সেই আনারসটি খেয়ে ফেলে এবং এই দূর্ঘটনা ঘটে। এখানে স্থানীয় মানুষের কোন ভুলের কারণে ঘটনাটি ঘটেনি।

বেশ কিছু খবরে হাতিটিকে বুনো বলা হলেও আইবি টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে হাতিটি কেরালার পালাক্কাড শহরের সাইলেন্ট ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের হাতি। হাতিটির ময়নাতদন্তকারী বুনো পশু বিশেষজ্ঞ ড. ডেভিড আব্রাহামের ভাষ্যমতে হাতিটির মৃত্যু হয়েছে ফুসফুস ও শ্বাসনালীতে পানি জমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। নিজের জখমের যন্ত্রণা ভোলাতে গিয়েই হয়ত হাতিটি এই পন্থা অবলম্বন করেছিলো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইনজামুল প্রান্তর এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন একটি হিসাব। যে হিসাবে দ্যা হিন্দু’র বিশ্লেষণ ধর্মী রিপোর্ট দেখা যায়। দ্যা হিন্দুর হিসাব অনুযায়ী ২০১৫-২০১৮ সালে, অর্থাৎ ৩ বছরে ১৭১৩ জন মানুষ সরাসরি হাতির হাতে খুন হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে হাতি মারা গেছে ৩৭৩ টি, যেখানে অধিকাংশ হাতিই রেললাইন পারাপার হতে গিয়ে অথবা বৈদ্যুতিক শক খেয়ে মারা গেছে। অর্থাৎ ঠিক যতোটা ঢালাওভাবে খবরটি প্রচার করা হচ্ছে ঠিক ততোটা ঢালাওভাবে অইসব অঞ্চলে হাতির হাতে মানুষ মারা যায়।

গত ৫ই মে এর ঘটনা, মাদারীপুর পৌরশহরের চরমুগরিয়ায় মধ্যখাগাদি গ্রামে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয় একে একে ১৬টি বানর। দুটি ঘটনার দিকেই চোখ তুলে তাকালে দেখা যাবে দুইটিতেই খাবারের মাধ্যমেই পশুর মৃত্যু হয়েছে। একজায়গায় একটি হাতি, অন্যদিকে ষোলটি বানর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছে শুধু একটি নিয়ে, অনলাইন পিটিশনে লাখো মানুষ সাইন করেছে শুধু একটি ঘটনায়।

করোনা ভাইরাসের কারণে যেই দূর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে সমগ্র বিশ্বে, সেইক্ষেত্রে মানুষেরা ঘরবন্দী থাকলেও চাঞ্চল্যতা ফিরে এসেছে কিন্তু প্রকৃতির মাঝে। পশুপাখিরা স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরন করছে প্রকৃতির মাঝে, প্রাণ ফিরে পেয়েছে যেন সমগ্র প্রকৃতি। সবাইকে অবাক করে দিয়ে অনেকটা আকস্মিকভাবেই ২০-২৫ বছরের বিরতির পর গত ২৩ মার্চ সকালে লাবনী ও কলাতলী পয়েন্টের মধ্যে ১০-১২টি ডলফিনকে প্রাণোচ্ছল ভাবে বিচরণ করতে দেখা যায়। এবং তার কিছুদিন পরেই গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সামলাপুরে এক ডলফিনের মরদেহ পাওয়া যায় এবং দেহে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন খেয়াল করা যায়।

কিছুদিন আগে হালদায় একটি ডলফিনকে বেশ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মাছ ধরার জালে ডলফিনটি ফেসে গেলে তাকে ধরে আঘাত করে মেরে ফেলা হয় অথচ আমরা সবাই জানি ডলফিন মানুষের বন্ধু। মানুষের পরেই সবথেকে বুদ্ধিমান প্রাণী নাকি এই ডলফিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ড. কিবরিয়া বিডিনিউজের টুয়েন্টিফোরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, “এই ডলফিনটি ছিলো একটি প্রাপ্তবয়ষ্ক মেয়ে ডলফিন এবং আজ পর্যন্ত এমন নৃশংসভাবে কখনো ডলফিন হত্যা করা হয়নি। আগে নিহত ডলফিনগুলোর বেশিরভাগই মারা যেত নৌযান ও বালু বোঝাইকারী ড্রেজারের আঘাতে।”

এইযে চারপাশে এত পশুপাখি হত্যা, এইযে চারপাশের মনুষ্যত্ববোধের লোপ পাওয়া, এগুলো নিয়ে সবসময়ই এইরকম নিন্দার ঝড় উঠলে সঠিক ঘটনাগুলো আর কখনোই ঘটতোনা। পাখি শিকারীদের বিরূদ্ধে কখনোই আন্দোলন হয়না, পিটিশন সাইন হয়না। অন্তঃসত্ত্বা হাতিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিন্দায় সয়লাব হয়ে উঠেছে।

ব্যক্তিগত পোস্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানান আকর্ষণীয় উপায়ে ঘটনাটিকে আবেগাপ্লুত করে ছবি প্রকাশ করছে এবং যার ছবি-লেখা যত বেশি আবেগপ্রবণ তার ছবি-লেখা তত বেশি মানুষের কাছে ছড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ খবরটা সম্পর্কে এইরকম বিষয়গুলো না ছড়ালেও হতো কি হতো না তা কিন্তু ভাববার বিষয়। একদমই অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটে যাওয়া একটা দূর্ঘটনাকে যেরকম বড় করে সকলেই নিন্দার ঝড় তুলছেন সেইরকম হাজারো ঘটনা প্রতিনিয়ত চারপাশেই ঘটে যাচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে, অথচ আমরা কেউই সচেতন হয়ে উঠিনি। আমাদের আবেগগুলো এখনও বেশ গন্ডিবদ্ধ। “অন্তঃসত্ত্বা”, “মা হাতি”, “মানুষকে বিশ্বাস করে আনারস খেয়েছিলো” এইসকল শব্দে আমাদের আবেগগুলো জমে ছিলো বলেই ২৭মে এর ঘটনা হুট করেই এক সপ্তাহ পরে নিন্দার ঝড়ের মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠে।

পশু-পাখিরা এই প্রকৃতির সম্পদ। ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা অনিচ্ছাকৃতভাবে হোক, কোন উপায়েই পশু হত্যার সমর্থন করা যাবেনা। পশুদের হাত থেকে ফসল-প্রাণ রক্ষা করতে ব্যতিক্রমধর্মী উপায় খুঁজে বের করতে হবে। পশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। আবেগের জায়গাগুলো ঘরের মাঝে আটকে রাখা ছোট্ট পাখির প্রতিও নিয়ে আসতে হবে, খাঁচার দরজা তখন এম্নিতেই খুলে যাবে। আকাশে উড়বে কোয়ারেন্টাইনে থাকা পাখিটিও। আহমদ ছফা স্যারের পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ উপন্যাসের মধ্যে আহমদ ছফা যেমন বৃক্ষ ও পাখি প্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন, ঠিক তেমনইভাবে নতুন করে সুস্থ হয়ে উঠা প্রকৃতির মাঝে পশু-পাখিদের নিরাপদ বিচরণের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। আবেগের বশে জেনে না জেনে একটামাত্র ঘটনা নিয়ে পড়ে থাকলে তো আর হবেনা, ঘরের কোনায় ছোট্ট চড়ুইয়ের দিকেও একটু আবেগ রেখে দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here